লাবণ্যকে আগের তুলনায় আজকে আরও ভীষণ সুন্দর লাগছে। পরনে পরেছে সে নীল জামা, বাহ্! যেন আকাশের সমস্ত রঙগুলি স্ব-ইচ্ছায় এসে তারা লাবণ্যের পুরো শরীরটাকে হৃদয় ছোঁয়া রঙে এঁকে দিয়েছে। আমার সোহাগের প্রিয় স্বর্গ-খোলা বুকটা সে তাঁর নীল জামাটির আড়ালে ধবধবে সাদা রঙের একটি ওড়নায় ঢেকে রেখেছে।
আহ্! মনে হয় যেন আকাশের সমস্ত সাদা বকগুলো উড়ে এসে ওদের দু দুটি ডানায় লাবণ্যের ঘামে ভেজা শরীরটাকে শীতল বাতাসে শুকিয়ে দিচ্ছে। শীতলা বাতাসে বসন্তদূত রঙের বাঁধা কেশগুলো এলোমেলো শব্দে বারংবার আমারও হৃদয়টিকে মাতাল তরঙ্গে ঢেউ তুলছে। যেন বহুদিন পরে আবারও একটা খুব সুন্দর মুহূর্ত আমার জীবনে ফিরে পেলাম। লাবণ্যের ওই ক্ষণের অপরূপ চেহারাটি ততক্ষণে আমি বিছানায় শুয়ে শুয়ে চাতক পাখিটির মতোই চুপচাপ চেয়ে চেয়ে দেখছিলাম।
আমি কিছুতেই তাঁর ওই অপরূপ চেহারাটি থেকে আমার দৃষ্টিটুকুও ফিরিয়ে নিতে পারছিলাম না। খুব ইচ্ছে করছিল তখনই ড্রেসিং টেবিলের সামনে থেকে ওকে ওর নরম হাতটি চেপে ধরে টেনে নিই এই শূন্য বুকটায়। কিন্তু সেটা করলেও তখন হয়তো আমার খুব বড় একটা বিপদও হতে পারে! যদি আমি তখন ওটাই করে বসতাম তবে হয়তো তখন লাবণ্য আমার উপর রেগেও যেতে পারে! এছাড়া অন্য কী আর করতে পারি আমি, সেটাই ভেবে ভেবে অসহায়ের মতো শুয়ে শুয়ে আমি ওর ওই অপরূপ চেহারাটাই তখন শুধু দেখছিলাম।
লাবণ্য আমাকে তার পৃথিবীর সব থেকে প্রিয় জিনিসটাই ভেবে থাকে। সে আমায় এতটাই ভালোবেসে- যে ভালোবাসাটুকু পেয়ে আমিও হারিয়ে ফেললাম জীবনের যাবতীয় সব কিছুর প্রয়োজনগুলো। কখনো সখনো আবার এটাও ভেবেছিলাম লাবণ্য যদি প্রকৃত গলার মালাটি হতো- তবে আমি সেটা ভেবেই সারাক্ষণ শুধু গলায় বেঁধে রাখতাম। কখনো কখনো লাবণ্যের ঐসব ভালোবাসায় আমি আমার পেটের ক্ষুধাটিও ভুলে গিয়ে নীরবে একটা দীর্ঘতম ঘুমের রাজ্যে হারিয়ে যেতাম।
অনন্ত সুখ অনুভবিত ঘুমের রাজ্য থেকে কখনই আমার সেই ঘুমটি থেকে জেগেও উঠতে ইচ্ছে করত না। কিন্তু বড়ই দুর্ভাগ্যের কপাল আমার! সুখের রাজ্যটিও ঘুরে-ফিরে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে দেখতে দেওয়া হতো না আমায়। অনেক অসহ্য অনুভব করতাম- যখন লাবণ্য আমার এই বুকের উপর রাখা তাঁর মাথাটা সরিয়ে নিত! সত্যিই তখন আমার খুব ইচ্ছে করেছিল যেন লাবণ্যকে ধরে তাঁর নরম তুলতুলে গাল দুটিতে কয়েকটা ঠুসঠাস চড় বসিয়ে দিই।
কিন্তু না, সেটিও আমি তখন সহজে করতে পারতাম না! কেননা সে যে আমারই জীবনের জীবন। যে জীবনটা আমারই সেই জীবনটাকে আমিই কীভাবে তাকে ধরে চড় মারি? অসম্ভব, সে তো প্রশ্নই ওঠে না! এতে তো বরং আমাকেই সেই আঘাতের ব্যথাটা সহ্য করতে হবে! না..! সেটা কেনো তবে আমি করব? যা আমি কখনও তা ভাবিওনি? তাঁর ওই গোলাপি দুটি গালে চড় মারা তো দূরের কথা- বরং তাঁর ওই নরম তুলতুলে গালে আমি কোনো একটি ফুলকেও স্পর্শ করতে দেইনি। যে দুটি গালে শুধু শত হাজার কোটি আমারই মুখের চুম্বনগুলো হেসে-খেলে দিন-রাত অতিবাহিত করে থাকে!
এটা ভেবেও আমি হেরে গেলাম! তবে আর আমি কোনটি করতে পারি? এরপরেও তো অন্তত আমাকে অফিসে না যাবার ক্ষেত্রে কোনো না কোনো একটা কৌশল খুঁজে বের করতেই হবে? কিন্তু সেটা কী ধরনের কৌশল? ঐ মুহূর্তে আমি তখন কী করব সেটিও ভেবে ভেবে কূল-কিনারা খুঁজে পাচ্ছিলাম না। লেপের নিচ থেকে আমি আমার ডান হাতটি বের করে ঘড়িটার দিকে একবার তাকিয়ে দেখলাম- তখন ঘড়িতে বাজতে চলছে সকাল সাতটা পঞ্চান্ন মিনিট।
সকাল নয়টায় আমার অফিস টাইম। পৌনে নয়টার মধ্যেই আমাকে এই সুখের রাজ্যটি ছেড়ে বেরিয়ে পড়তে হবে। এখান থেকে আমার অনুভবিত নরক নামক অফিসটা ছিল আধা কিলোমিটার দূরে। আমার অফিসটিকে আমি সব সময় নরকই ভেবে থাকি! তার কারণটি হলো, যে অফিসে ঐ সময়ের জন্য আমার জীবনটাই কাছে থাকে না- তখন কি আমি সেটিকে নরক না ভেবে কি স্বর্গ ভাববো? কখনই না, ওটা আমার কাছে কখনো অফিসই মনে হতো না বরং নরকই মনে হতো।
অফিসে পৌঁছাতে আমার সময় লেগে যায় প্রায় দশ-বারো মিনিটের মতো। এতক্ষণে আমাকে বিছানা থেকে উঠে পড়ার কথা ছিল। বিছানা থেকে উঠে আমাকে দাঁত ব্রাশ, গোসল, সকালের নাস্তা ইত্যাদি সেরে নিয়ে অফিসে যাবার জন্যও নিজেকে সেজেগুজে নিয়ে তৈরি থাকবার কথাটিও ছিল! কিন্তু আজ লাবণ্যের ঐ অপূর্ব রূপের ঝলসানো চেহারাটি দেখার পর আমার তখন বিছানা থেকেও উঠতে ইচ্ছে করছিল না।
একবার অবশ্য সিদ্ধান্ত নিয়েই ফেললাম! নাহ্, আজ আর আমি কিছুতেই অফিসে যাব না! কিন্তু.. অফিসে তো আমার বিভিন্ন কাজ-কর্মগুলিও পড়ে আছে? আজকে যদি আমি অফিসে না-ই বা যাই তবে তো আমার সিনিয়র বস আমাকে চাকরি থেকে বহিষ্কারও করে দিতে পারেন? তখন তো আমার এই সুখের সংসারে দুঃখেরও আগুনে জ্বলতে পারে?
অফিসের কথাটা না হয় বাদই দিলাম, কিন্তু লাবণ্য? ওকে আমি কীভাবে বোঝাব যে আজকে আমি অফিসে যাচ্ছি না! সে তো তখন আমায় অনেক কিছুই জিজ্ঞেস করে বসতে পারে? তখন আমি ওর ওইসব কথাগুলির জবাব কী দেব?
কী করব- ভেবেও পাচ্ছিলাম না। আবারও হাতের ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম, তখন আটটা পাঁচ মিনিট বাজতে চলছে। কী করি-কি করি, ভাবতে ভাবতেই হঠাৎ আমার ততক্ষণে মাথায় একটা সুন্দর অভিনয়ের কৌশল এসে ভর করল।
তবে সেই কৌশলটা যদি আমি কাজে লাগাতে পারি- তবেই হয়তো আজ অফিসে না যাবার সুযোগটিও পেয়ে যেতে পারি। কিছুক্ষণ পরই হয়তো লাবণ্য আমাকে বিছানা থেকে ডেকে তুলতে পারে! আমি মিটিমিটি দেখছিলাম লাবণ্য ড্রেসিং টেবিলের সামনে বসে তাঁর এলোমেলো উড়ন্ত মাথার কেশগুলো দু-হাতে বেণি করছিল। ততক্ষণে আমি আমার কলাকৌশলের অভিনয়টা করতে শুরু করলাম-
তার আগে এখানে আমাদের দুজনের কিছু অতীতের বহু পুরোনো আরও একটি সুন্দর মুহূর্তের কথা না জানিয়ে আর চুপ থাকতে পারলাম না।
সেদিন লাবণ্য ঘরের মেঝেতে বসে আমার একটি করে হাত তাঁর জামার কোঁচায় টেনে নিয়ে আঙুলের বড় বড় নখগুলি সে ব্লেড দ্বারা কেটে দিচ্ছিল। আমি একটুখানি এদিক-সেদিক নড়ানড়ি করতেই ওর হাতের নতুন ব্লেডটি হুট করে আমার হাতের একটি নখের সামান্য কিছু অংশ কেটে গিয়েছিল।
এতটুকুই কেটেছিল যে তাতে আমি একটুও ব্যথা অনুভব করতে পারিনি। অথচ লাবণ্য সে আমার হাতটি ওইভাবে সামান্য একটুখানি কেটেছিল বলে সে-ই বরং কেটে যাবার ব্যথাটা অনুভব করে আঃ উঃ করে উঠেছিল। সত্যিই যেন সে আমারই দেহের প্রতিটি অঙ্গ। তাছাড়া সে যদি আমার দেহের প্রতিটি অঙ্গ না-ই হতো- তবে কেন আমি ব্যথা পাওয়াতে তাঁরই আগে খুব বেশি কষ্ট হতো? অনেক সময় আমি এটিও ভাবতাম যে, সে-ই ছিল এ দেহের হৃৎপিণ্ড।
–উঃ…আঃ….ইস্
লাবণ্যের কানে বেদনাদায়ক আমার এই অভিনয়ের শব্দটা পৌঁছাতেই তখন ঐ সময় ওর মনে হয়েছিল যেন তাঁরই সশরীরে কোনো না কোনো অঙ্গে সে-ই ব্যথা অনুভব করছে! লাবণ্য টুল থেকে দৌড়ে উঠে এসে তখন সে আমায় বলে বসল,
–উঃ হু রে, কী হলো? এমন করছ কেন? কোথায় আঘাত পেলে দেখি? একটু কি তুমি দেখে-শুনেও উঠতে পারো না? দেখি, দেখি?
ভাবলাম, আমার অভিনয়ের কৌশলটা বুঝি এবার ভালোভাবেই কাজ করতে পেরেছে! যাক্ আজকের জন্য হয়তো অফিসে যাওয়াটা আমি বেঁচে যাব। আমার শরীরের উপর থেকে লাবণ্য লেপটি সরিয়ে নিয়ে তাঁর কোমল দুটি হাত দ্বারা আমার দেহের বিভিন্ন স্থানে স্পর্শ করে খুঁজছিল যে আমি কোথায় আঘাত পেয়েছি। ঐ সময় আমার যে কতটাই না ভালো লেগেছিল সে কথাটি আর আমি এখানে বুঝিয়ে বলতে পারছি না। মাঝে-মধ্যে ওর ঐ হাতের স্পর্শগুলো পেলে আমার সমস্ত শরীরের লোমগুলো শিউরে উঠত এবং নিজেকে আমি কোনো অবস্থাতেও কন্ট্রোল করতে পারতাম না। তখনকার তাঁর ওই কোমল হাতের সুড়সুড়িগুলো সহ্য করতে না পেরে তখন আমি ওকে একটু উঁচু গলায়ই বলে বসলাম,
–আচ্ছা তুমি কি পাগলী হয়ে গেলে নাকি? এভাবে তুমি কী খুঁজছ বলো তো?
–না, মানে, দেখছিলাম যে তুমি কোথায় আঘাত পেলে!
–মানে? ও…তার মানে তুমি কি বুঝতে পারছ না যে, আমি কোথায় আঘাত পেয়েছি? আচ্ছা তুমি আমাকে এভাবে কেন আঘাত করো, বলো তো শুনি? আমি যে তোমার দেওয়া এমন আঘাতগুলো কিছুতেই সইতে পারি না! সেটাও কী তুমি বুঝতে পারো না, হুম?
–হায়…হায়…কখন? কখন? কখন গো আমি তোমাকে আঘাত করলাম? অযথা কেন তুমি আমায় মিথ্যে অপবাদ দিচ্ছ…বলো তো?
–না থাক্, সে কথা বলে আর কী লাভ! আসলে আমার কপালটাই তো খারাপ! আমাকে কি সেভাবে কেউ আর বুঝতে পারে!
–আচ্ছা বাবা ঠিক আছে…বাদ দাও তো এখন এসব কথা! তার আগে বলো কোথায় আঘাত পেলে তুমি?
–শুনবে তাহলে, তো শোনো- কোথায় আঘাত পেয়েছি? দেখো এই যে এইখানে- বুকের এই বাম পাশে ভীষণ ব্যথা করছে!
–কই দেখি.. দেখি…?
লাবণ্য একথাটি বলতেই শরীর থেকে আমার পরনের গেঞ্জিটা খুলে ফেলল।
–এভাবে কি কেউ বুকের ব্যথাগুলো বুঝতে পারে? বুকের ব্যথা বুঝতে হলে- তাকে তার মাথাটা বুকের উপরে রেখেই কান পেতে শুনে বুঝতে হয়, বুঝলে?
–ধুর, তুমি যে কী কও না, তোমার এসব কথা আমি কিছুই বুঝতে পারি না! দেখি, সরাও তো দেখি তোমার হাতটা! দেখি কোথায় ব্যথা পেয়েছ!
লাবণ্য আমার বাম বুকের উপর ওর কানটা লাগিয়ে নীরবে শুনছিল যে- আমি কোথায় ব্যথা পেয়েছিলাম! সত্যি যেন সে আমার পাগলী। আর আমি ওর মাথাটি আমার বুকের উপর ওভাবে পেয়ে দুটি হাতে ওকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিলাম। লাবণ্য কিছুক্ষণ ওভাবে কান পেতে শোনার পর সে আমায় জিজ্ঞেস করল,
–কই, আমি তো কিছুই বুঝতে পারছি না, কোথায় ব্যথা পেয়েছ?
তখন ওর ওই প্রশ্নটির জবাব আমি এভাবেই বলে দিয়েছিলাম,
–মনে হয় ব্যথাটা এখন আর সেখানে নেই, অন্য কোথাও পালিয়ে গেছে!
লাবণ্য ততক্ষণে বুঝতে পেরেছিল যে, ওসব আমার সবই ছিল ওর কাছ থেকে শুধুমাত্র কিছু ভালোবাসা পাবার জন্যই অভিনয়। বুকের উপর থেকে লাবণ্য তাঁর মাথাটি তুলে আমার বাম পাশের বুকের উপর নরম দুটি ঠোঁটে বহুবার সে চুম্বন এঁকে দিয়েছিল। চুম্বনগুলো দেবার পর শেষে সে আমায় বলল,
–এই তো আমি, তোমারই বুকের বাম পাশে লুকিয়ে আছি? হয়েছে, এখন লক্ষ্মী সোনার মতো বিছানা থেকে উঠে সোজা অফিসে চলে যাও!
[বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই অংশে গল্পটিতে ছেলেটির নামটি উল্লেখ করা হয়নি, ওর নাম ছিল ‘আন্তন’। আন্তন লাবণ্যের কাছ থেকে ওই ভালোবাসাগুলো পাওয়ার পর সেদিন সে অফিসে গিয়েছিল কি না সে বিষয়ে পরে কোনো একদিন তুলে ধরা হবে।
ভালোবাসার গভীরত্বের বন্ধনে সবার জীবনটা কাটুক- এই প্রত্যাশায় রইল অসংখ্য ধন্যবাদ।]
রচনাকাল: ০৭-০১-২০২০ইং।
মন্তব্য করুন