অমলদের গ্রামের নাম ছিল রূপনগর। কিন্তু নামটা কে দিয়েছিল, তা কেউ বলতে পারত না। তবে কেন দিয়েছিল, তা অনুমান করা যায়।
এত সুন্দর একটি গ্রাম- সবুজে ঘেরা, মাঠে মাঠে ফসল, সকালে পাখিদের ডাকাডাকি, গাছভরা ফুল-ফল, গ্রামের সুন্দর মেঠোপথ- আরও কত কী! কোনো কিছুরই যেন কমতি নেই গ্রামে।
তবুও গ্রামের মানুষগুলো কেমন যেন ছন্নছাড়া জীবন কাটায়। কেনই বা কাটাবে না? পেটে ভাত না থাকলে গ্রামের নাম রূপনগর হলেই বা কী! গ্রামের এত রূপ থাকলেই বা কী! অভাবের কাছে সৌন্দর্যও যেন ম্লান হয়ে যায়।
তবু একটা চিন্তা আমাকে ভাবায়- রূপনগরের এত রূপ, অথচ এই গ্রামের মানুষের এত অভাব কেন?
আচ্ছা, এত রূপ থাকার পরও যদি অভাব থাকে, তাহলে এই গ্রামের মানুষগুলোর রূপের প্রতি এত মোহ কেন?
কেনই বা বেশিরভাগ মানুষ রূপ দেখে মানুষকে বিচার করে?
আমার একটু অবাকই লাগে!
গ্রামের এক কোণে একটি ছোট কুঁড়েঘরে অমল বসবাস করত। অমলের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। ছেলেটির বাবা মারা গিয়েছিলেন, যখন তার বয়স মাত্র ছয় বছর। ঘরে ছিল তার বৃদ্ধা মা আর সে। দিন এনে দিন খেয়ে কোনো রকমে তাদের সংসার চলত।
তার ওপর অমল ছিল কালো, খুব একটা লম্বাও নয়। চুলগুলো কেমন যেন ফ্যাকাশে। তার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিও ছিল না। কিন্তু ছেলেটি ছিল অত্যন্ত সহজ-সরল ও ভদ্র।
তবু এই গ্রামের মানুষ সরলতা কিংবা ভদ্রতার চেয়ে চেহারাকেই বেশি প্রাধান্য দিত। তাই অমলকে তারা একটু হেয় করেই দেখত। তার সঙ্গে মিশতে চাইত না। তবুও অমল তার বৃদ্ধা মাকে নিয়ে কোনো রকমে দিন কাটিয়ে দিচ্ছিল।
কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হলো তখন, যখন গ্রামের সবচেয়ে রূপবতী মেয়ে চারুর সঙ্গে অমলের ভালোবাসার কথা গ্রামের লোকেরা জানতে পারল।
চারু অমলের সরল মনটাকেই ভালোবেসেছিল, চেহারাকে নয়। অমলও চারুকে ভালোবেসে ফেলেছিল। তারা দুজন লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করত, চিঠি দেওয়া-নেওয়া করত। কখনো কখনো অমল নিজের বাজারের টাকা থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে চারুর জন্য একজোড়া কাচের চুড়ি কিনে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে দিয়ে আসত।
এভাবেই ভালোই চলছিল কয়েক দিন।
তারা ভেবেছিল, অমলের একটু আর্থিক স্বচ্ছলতা এলেই তারা বিয়ে করবে।
কিন্তু তা আর হলো কই!
একদিন গ্রামের লোকজন বকুলগাছের নিচে তাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখে ফেলল। তারপর শুরু হলো সালিশ, বিচার, কটুকথা, সমাজের হাজারো বাধা- কত কী!
চারুর অপরাধ- সে কুৎসিত চেহারার অমলকে কেন ভালোবেসেছে?
আর অমলের অপরাধ- নিজের এই তথাকথিত কুৎসিত চেহারা নিয়ে কোন সাহসে সে চারুকে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখেছে?
গ্রামের সবাই যখন তাদের কাছে এই প্রশ্নগুলো করছিল এবং অমলকে রীতিমতো মারতে যাচ্ছিল, তখন অমল চুপ করে ছিল। তার বৃদ্ধা মা কাঁদছিলেন।
কিন্তু চারু চুপ থাকেনি।
সে দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল,
চেহারা হলেই কি মানুষ ভালোবাসতে পারে? আমি অমলের এই কুৎসিত চেহারাকেই ভালোবাসি, আর সারাজীবন ভালোবাসব।
চারুর কথা শুনে গ্রামের লোকেরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। তারা সাফ জানিয়ে দিল, এই গ্রামে বাস করতে চাইলে চারুকে অমলকে ছেড়ে দিতে হবে। তা না হলে এই গ্রামে তাদের ঠাঁই হবে না।
সেই যে সেদিন চারু অমলের হাত ধরে, অমলের বৃদ্ধা মাকে সঙ্গে নিয়ে রূপনগর গ্রাম ছেড়ে চলে গেল।
তারপর থেকে আজও তারা আর সেই রূপনগরে ফিরে যায়নি।
আজ অমল-চারুর ছোট্ট একটি সংসার হয়েছে। অমল একটি পোস্ট অফিসে চাকরি পেয়েছে। তাদের সংসারে এসেছে ছোট্ট একটি মেয়ে। আজ তারা সুখেই আছে।
কিন্তু সেই রূপনগরে আজও সেই অভাবই আছে।
কে জানে- ভাতের অভাব, নাকি রূপের?
রূপেরই বোধহয়!
আচ্ছা, রূপের অভাব হলে কি গ্রামের নাম রূপনগর হয়?
কে জানে, বাবা!
যাকগে।
রচনাকাল: ২৬-০৯-২০২৬ ইং।
অমলদের গ্রামের নাম ছিল রূপনগর। কিন্তু নামটা কে দিয়েছিল, তা কেউ বলতে পারত না। তবে কেন দিয়েছিল, তা অনুমান করা যায়।
এত সুন্দর একটি গ্রাম- সবুজে ঘেরা, মাঠে মাঠে ফসল, সকালে পাখিদের ডাকাডাকি, গাছভরা ফুল-ফল, গ্রামের সুন্দর মেঠোপথ- আরও কত কী! কোনো কিছুরই যেন কমতি নেই গ্রামে।
তবুও গ্রামের মানুষগুলো কেমন যেন ছন্নছাড়া জীবন কাটায়। কেনই বা কাটাবে না? পেটে ভাত না থাকলে গ্রামের নাম রূপনগর হলেই বা কী! গ্রামের এত রূপ থাকলেই বা কী! অভাবের কাছে সৌন্দর্যও যেন ম্লান হয়ে যায়।
তবু একটা চিন্তা আমাকে ভাবায়- রূপনগরের এত রূপ, অথচ এই গ্রামের মানুষের এত অভাব কেন?
আচ্ছা, এত রূপ থাকার পরও যদি অভাব থাকে, তাহলে এই গ্রামের মানুষগুলোর রূপের প্রতি এত মোহ কেন?
কেনই বা বেশিরভাগ মানুষ রূপ দেখে মানুষকে বিচার করে?
আমার একটু অবাকই লাগে!
গ্রামের এক কোণে একটি ছোট কুঁড়েঘরে অমল বসবাস করত। অমলের অবস্থা ছিল খুবই খারাপ। ছেলেটির বাবা মারা গিয়েছিলেন, যখন তার বয়স মাত্র ছয় বছর। ঘরে ছিল তার বৃদ্ধা মা আর সে। দিন এনে দিন খেয়ে কোনো রকমে তাদের সংসার চলত।
তার ওপর অমল ছিল কালো, খুব একটা লম্বাও নয়। চুলগুলো কেমন যেন ফ্যাকাশে। তার এক হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলিও ছিল না। কিন্তু ছেলেটি ছিল অত্যন্ত সহজ-সরল ও ভদ্র।
তবু এই গ্রামের মানুষ সরলতা কিংবা ভদ্রতার চেয়ে চেহারাকেই বেশি প্রাধান্য দিত। তাই অমলকে তারা একটু হেয় করেই দেখত। তার সঙ্গে মিশতে চাইত না। তবুও অমল তার বৃদ্ধা মাকে নিয়ে কোনো রকমে দিন কাটিয়ে দিচ্ছিল।
কিন্তু সমস্যা সৃষ্টি হলো তখন, যখন গ্রামের সবচেয়ে রূপবতী মেয়ে চারুর সঙ্গে অমলের ভালোবাসার কথা গ্রামের লোকেরা জানতে পারল।
চারু অমলের সরল মনটাকেই ভালোবেসেছিল, চেহারাকে নয়। অমলও চারুকে ভালোবেসে ফেলেছিল। তারা দুজন লুকিয়ে লুকিয়ে দেখা করত, চিঠি দেওয়া-নেওয়া করত। কখনো কখনো অমল নিজের বাজারের টাকা থেকে কিছু টাকা বাঁচিয়ে চারুর জন্য একজোড়া কাচের চুড়ি কিনে নিয়ে গিয়ে লুকিয়ে দিয়ে আসত।
এভাবেই ভালোই চলছিল কয়েক দিন।
তারা ভেবেছিল, অমলের একটু আর্থিক স্বচ্ছলতা এলেই তারা বিয়ে করবে।
কিন্তু তা আর হলো কই!
একদিন গ্রামের লোকজন বকুলগাছের নিচে তাদের দুজনকে একসঙ্গে দেখে ফেলল। তারপর শুরু হলো সালিশ, বিচার, কটুকথা, সমাজের হাজারো বাধা- কত কী!
চারুর অপরাধ- সে কুৎসিত চেহারার অমলকে কেন ভালোবেসেছে?
আর অমলের অপরাধ- নিজের এই তথাকথিত কুৎসিত চেহারা নিয়ে কোন সাহসে সে চারুকে ভালোবাসার স্বপ্ন দেখেছে?
গ্রামের সবাই যখন তাদের কাছে এই প্রশ্নগুলো করছিল এবং অমলকে রীতিমতো মারতে যাচ্ছিল, তখন অমল চুপ করে ছিল। তার বৃদ্ধা মা কাঁদছিলেন।
কিন্তু চারু চুপ থাকেনি।
সে দৃঢ় কণ্ঠে বলেছিল,
চেহারা হলেই কি মানুষ ভালোবাসতে পারে? আমি অমলের এই কুৎসিত চেহারাকেই ভালোবাসি, আর সারাজীবন ভালোবাসব।
চারুর কথা শুনে গ্রামের লোকেরা আরও ক্ষিপ্ত হয়ে উঠল। তারা সাফ জানিয়ে দিল, এই গ্রামে বাস করতে চাইলে চারুকে অমলকে ছেড়ে দিতে হবে। তা না হলে এই গ্রামে তাদের ঠাঁই হবে না।
সেই যে সেদিন চারু অমলের হাত ধরে, অমলের বৃদ্ধা মাকে সঙ্গে নিয়ে রূপনগর গ্রাম ছেড়ে চলে গেল।
তারপর থেকে আজও তারা আর সেই রূপনগরে ফিরে যায়নি।
আজ অমল-চারুর ছোট্ট একটি সংসার হয়েছে। অমল একটি পোস্ট অফিসে চাকরি পেয়েছে। তাদের সংসারে এসেছে ছোট্ট একটি মেয়ে। আজ তারা সুখেই আছে।
কিন্তু সেই রূপনগরে আজও সেই অভাবই আছে।
কে জানে- ভাতের অভাব, নাকি রূপের?
রূপেরই বোধহয়!
আচ্ছা, রূপের অভাব হলে কি গ্রামের নাম রূপনগর হয়?
কে জানে, বাবা!
যাকগে।
রচনাকাল: ২৬-০৯-২০২৬ ইং।
মন্তব্য করুন