আজ বৃহস্পতিবার। ছোট ঘণ্টা, অর্ধেক ক্লাস। ম্যাম বাংলা কবিতা পড়াচ্ছেন,
~“আমি হব সকাল বেলার পাখি সবার আগে কুসুম-বাগে উঠব আমি ডাকি।”
ছবি: খালিদ মামুন
শেষ ঘণ্টার ক্লাস বলে ছেলেমেয়েদের মধ্যেও একটু ছুটির আমেজ। কেউ জানালার বাইরে তাকিয়ে আছে, কেউ খাতার পাতায় আঁকিবুঁকি কাটছে। ম্যাম অবশ্য সেদিকে কান না দিয়ে কবিতা পড়িয়ে চলেছেন।
কয়েকজন মিলে ম্যামের সঙ্গে কবিতার লাইন আওড়াচ্ছিল।
এমন সময় হঠাৎ নুর দাঁড়িয়ে গেল।
~ম্যাম, আমি পাখি হব কীভাবে?
প্রশ্নটা শুনে পুরো ক্লাস যেন এক মুহূর্তের জন্য থেমে গেল।
পাশ থেকে আছিব ফিসফিসিয়ে বলল,
~বস। পাগলের মতো প্রশ্ন করিস কেন?
কথাটা ম্যামের কানে যেতে দেরি হলো না। তিনি একটু হেসে আছিবের দিকে তাকালেন।
~আচ্ছা আছিব, তুমি কি পাখি হতে চাও না, ওর মতো?
আছিব এবার একটু অপ্রস্তুত। মাথা নিচু করে বলল,
~জি ম্যাম, আমিও পাখি হতে চাই।
ম্যাম হাসলেন। তারপর নুরের দিকে তাকিয়ে বললেন,
~পাখি হওয়া মানে কিন্তু শুধু ডানা মেলে আকাশে উড়ে বেড়ানো নয়। মানুষও পাখি হতে পারে, তার চিন্তার মধ্যে। যখন মানুষের চিন্তার বিকাশ ঘটে, তখন তার মনের আকাশটা অনেক বড় হয়ে যায়। তখন সে নিজের ছোট্ট গণ্ডির বাইরে ভাবতে শেখে। পৃথিবীর এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্তে তার শরীর না গেলেও তার চিন্তা ঠিকই পৌঁছে যেতে পারে।
ক্লাসের ছেলেমেয়েরা এবার মন দিয়ে শুনছে।
ম্যাম একটু থামলেন। তারপর ধীরে ধীরে বললেন,
~তবে এই পাখি হওয়া সহজ নয়, নুর। অনেক সাধনা লাগে। মানুষের জীবনে সবচেয়ে বড় স্বাধীনতাগুলোর একটি হলো স্বাধীনভাবে চিন্তা করতে পারা। আবার অদ্ভুত ব্যাপার কী জানো? সেই চিন্তাই কখনো কখনো মানুষকে অদৃশ্য শিকলে বেঁধে ফেলে।
নুরের কপাল কুঁচকে গেল।
~চিন্তার স্বাধীনতা কী, ম্যাম?
ম্যাম কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপর ম্যাম জবাবে কাজী নজরুল ইসলামের ‘চিরতরুণ’ কবিতা থেকে দুই লাইন আবৃত্তি করে শোনান:
~“মোরা বন্ধনহীন, জন্মস্বাধীন, চিন্তামুক্ত শতদল, মোরা চিরতরুণ, চিরদুর্দম, চিরউন্নত শির।”
ছোট্ট নুর এত বড় কথার সবটা বুঝল না। কিন্তু কথাগুলো কোথাও যেন তার ভেতরে গিয়ে লাগল। অজান্তেই ঠোঁটের কোণে ফুটে উঠল একটুখানি হাসি।
নুরের সেই মুচকি হাসি দেখে আছিবও হেসে ফেলল।
আছিবকে হাসতে দেখে ম্যামের মুখেও হাসি ফুটে উঠল।
ঠিক তখনই ছুটির ঘণ্টা বেজে উঠল।
বৃহস্পতিবারের অর্ধেক ক্লাস শেষ।
সবাই তাড়াহুড়ো করে বই খাতা গুছিয়ে নিল। নুরও ব্যাগটা পিঠে তুলে নিল। তারপর বন্ধুদের সঙ্গে স্কুলের গেট পেরিয়ে বাড়ির পথ ধরল।
আজ তার হাঁটাটা অন্য দিনের মতো নয়। বারবার ম্যামের কথাগুলো মনে পড়ছে।
হাঁটতে হাঁটতে নুর আকাশের দিকে তাকাল। কয়েকটা পাখি উড়ে যাচ্ছিল। সে কিছুক্ষণ সেদিকে তাকিয়ে রইল।
তারপর নিজের অজান্তেই একটু হাসল।
হয়তো ম্যাম ঠিকই বলেছেন। পাখি হতে হলে সব সময় ডানা লাগে না। নিজের মতো করে ভাবতে পারাটাও এক ধরনের উড়ে যাওয়া।
নুর জানে না, সে কবে সত্যিকারের পাখি হবে। তবে আজ তার মনে একটা ছোট্ট বিশ্বাস জন্মেছে। হয়তো সেও একদিন নিজের মনের আকাশে উড়বে।
তার ডানা থাকবে না, তবু সে উড়তে পারবে।
মনের ডানায়!
রচনাকাল: ১৮-০৯-২০২৬ইং।
মন্তব্য করুন