সুহাসিনীর অনেক ইচ্ছা ছিল আমার বউ হবে। আমার সঙ্গে সংসার বাঁধার অনেক শখ ছিল ওর। আজ অবশেষে সেই বউ হওয়ার শখ আমার সুহাসিনীর পূর্ণ হয়েছে।
আমার নাম অমরেশ সাহা। কিন্তু সুহাসিনী আমাকে বরাবরই ‘সাহাবাবু’ বলে ডাকত।
আমাদের পরিচয় কলেজ থেকে। তারপর ধীরে ধীরে প্রেমের সম্পর্ক গড়ে ওঠে আমাদের মধ্যে। দীর্ঘ সাত বছরের প্রেমের পর পারিবারিকভাবেই আমাদের বিয়ে ঠিক হয়। আমাদের দুজনেরই ইচ্ছা ছিল, আমাদের বিয়ে হবে নবমীর এক জোছনা রাতে। সেইভাবেই তারিখ ঠিক করেছিলাম আমরা।
প্রথমে কেউ আমাদের মেনে নেয়নি। আমাদের পরিবারের কেউই রাজি ছিল না আমাদের বিয়ে দিতে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত আমরা এক হয়েছি আমাদের ভালোবাসার দৃঢ়তার কারণে। আমরা কেউ কাউকে ছেড়ে যাইনি কখনো।
আমার অনেক ইচ্ছা ছিল- আমি সুহাসিনীর সঙ্গে সংসার করব, ঘুরব, ফিরব, বিয়ের পর একসঙ্গে থেকে ঝগড়া করব, আবার ভালোবাসব। আরও কত কী! সেই ছোট ছোট স্বপ্নগুলোই তো আমার কাছে পুরো একটা জীবনের সমান ছিল।
কিন্তু আমার সুহাসিনীর এত ইচ্ছা ছিল না কখনোই।
একদিন আমি ওকে বলেছিলাম-
“আচ্ছা সুহাসিনী, আমার যে তোমাকে বিয়ে করার পর কত ইচ্ছা! কিন্তু তুমি তো কখনো আমাকে তোমার ইচ্ছার কথা বললে না! শুধু ভালোবেসেই গেলে!”
সেদিন সে আমাকে তার ইচ্ছার কথা বলেছিল। ওর কথা শুনে নিজেকে সামলাতে না পেরে আমি কান্না করে দিয়েছিলাম। মনে হয়েছিল, এতদিন যাকে নিয়ে ভবিষ্যৎ কল্পনা করেছি, সে যেন নিজের ভবিষ্যৎটুকুও আমার হাতের বাইরে রেখে দিয়েছে।
সুহাসিনী আমাকে বলেছিল-
“নববধূ যেমন সাজে, আমিও ঠিক তেমনভাবেই হাতে শাঁখা-পলা, পায়ে আলতা, সিঁথিভরা সিঁদুর নিয়ে দুনিয়া ছাড়ব, সাহাবাবু! এ যে আমার বড় সাধ।”
সেদিন আমি কাঁদতে কাঁদতে বলেছিলাম-
“এসব তুমি কী বলো, সুহাসিনী? আমি বেঁচে থাকতে আমার থেকে তোমাকে কেউ নিয়ে যেতে পারবে না। কেউ না। তুমি এসব মুখে আনবে না কখনো আর।”
তারপর সুহাসিনী হাসতে হাসতে বলেছিল-
“আরে পাগল! তোমার হাতের সিঁদুর নিয়ে দুনিয়া ছাড়ব- এর থেকে সুখের আর কিছু আছে? এটা যে আমার সৌভাগ্য, সাহাবাবু। আমার সাহাবাবুর হাতের সিঁদুর পড়ার পর আমি যেখানেই থাকি, সুখে-শান্তিতেই থাকব। বোকা!”
কিন্তু আমি ওকে আর কথা বাড়াতে দিইনি। কেননা, আর কটা দিন পরই তো আমরা এক হব। দীর্ঘ সাত বছর পর আমাদের ভালোবাসা পূর্ণতা পাবে এই নবমীর রাতে। এখন এসব বলে মন খারাপ করার কোনো কারণই নেই। এখন আমাদের আর কোনো বাধা নেই। অন্তত আমি তাই বিশ্বাস করতে চেয়েছিলাম।
যাই হোক, অবশেষে আজ সেই নবমী তিথি।
আমাদের সারাজীবনের স্বপ্নের নবমী তিথি।
আজ আমার সুহাসিনী আমার হাতের সিঁদুর সিঁথিভরে পড়েছে। আমার জন্য পায়ে আলতা পরেছে, হাতে শাঁখা-পলা পরেছে। একদম নববধূর মতো সেজেছে আমার সুহাসিনী- আজ, যেমনটা সে চেয়েছিল।
আমার সুহাসিনীর সব ইচ্ছাই পূরণ হলো।
কিন্তু আমার ইচ্ছা যে পূরণ হলো না কিছুই!
আমাকে একবার নববধূর সাজে ‘সাহাবাবু’ বলে ডাক পর্যন্ত দিল না আমার সুহাসিনী আজ! যে ডাকের জন্য সাত বছর অপেক্ষা করেছি, সেই ডাকটুকুও আজ আমার কানে পৌঁছাল না।
আমার স্বপ্ন আর পূরণ হলো না কিছুই!
আচ্ছা, আমার সুহাসিনীর কী হয়েছিল?
আমার এত আফসোস হচ্ছে কেন?
আজ তো ও আমার বউ। আমাদের দুজনকে আলাদা করে দেওয়ার মতো আর কেউ নেই আজ। কিন্তু সুহাসিনী কেন আজ আমাকে এভাবে বেঁধে দিল? কেন আমার হাতের নাগালের এত কাছে থেকেও আমাকে একেবারে অসহায় করে রেখে গেল?
আজ নবমী তিথির রাতে এই শ্মশানে, এই শেষ ঠিকানার কাছে দাঁড়িয়ে আমার ঘুমন্ত সুহাসিনীকে নিজ হাতে সিঁদুর পরালাম আমি। নিজ হাতে শাঁখা-পলা পরিয়ে দিলাম। নিজ হাতে আমার সুহাসিনীর পায়ে লাল টকটকে আলতা পরিয়ে দিলাম। আমার হাত কাঁপছিল, চোখ ঝাপসা হয়ে আসছিল, তবু থামতে পারিনি। এ তো তার শেষ ইচ্ছা- আর এই শেষ ইচ্ছেটুকু পূরণ করার অধিকারটুকুই এখন আমার কাছে বাকি।
জানো, তখন আমার মনে পড়ছিল আমার সুহাসিনী আমাকে বলেছিল-
“নববধূ যেমন সাজে, আমিও ঠিক তেমনভাবেই হাতে শাঁখা-পলা, পায়ে আলতা, সিঁথিভরা সিঁদুর নিয়ে দুনিয়া ছাড়ব, সাহাবাবু! এ যে আমার বড় সাধ।”
আচ্ছা, আজ আমার সুহাসিনী কি সত্যি সুখী? আমার হাতের সিঁদুরে, আমার ভালোবাসায়, এই অসম্পূর্ণ বিয়েতে- সে কি সত্যিই তার সাধ পূর্ণ হয়েছে?
রচনাকাল: ০৪-১০-২০২৬ইং।
লেখক: বাঁধন মৈত্র
শিক্ষার্থী: বাংলা বিভাগ, ঢাকা সেন্ট্রাল ইউনিভার্সিটি (ঢাকা কলেজ ক্যাম্পাস)
মন্তব্য করুন