লেখক: মো. ফায়েকুজ্জামান মিয়া
আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ক্যালেন্ডারে দিনটি বছরে একবার ফিরে আসে; কিন্তু মানুষের জীবনে শিক্ষকের উপস্থিতি কোনো একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বয়স যত বাড়ে, ততই বুঝি- আমরা আসলে একা একা বড় হই না। আমাদের ভেতরে একটু একটু করে বাস করতে থাকেন অনেক মানুষ। কারও শেখানো একটি অক্ষর, কারও কড়া শাসন, কারও বলা একটি বাক্য, কারও নীরব স্নেহ, কারও সততা, কারও ব্যক্তিত্ব- সব মিলিয়েই গড়ে ওঠে একজন মানুষ। তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমার কাছে শিক্ষককে স্মরণ করা মানে কেবল শ্রেণিকক্ষের শিক্ষককে মনে করা নয়; বরং যাঁরা জীবনটাকে একটু ভালো করে বুঝতে শিখিয়েছেন, তাঁদের সবার সামনে কৃতজ্ঞচিত্তে মাথা নত করা।
আমার শেখার হাতে খড়ি প্রিয় আব্বাজান আর মায়ের কাছে। পৃথিবীতে প্রথম ভাষা, প্রথম আচরণ, প্রথম ভালো-মন্দের বোধ- সবকিছুর শুরু তাঁদের হাত ধরে। আর আমার সহোদর রোকনউজ্জামান আমার জীবনের সেরা শিক্ষকদের একজন নন, বরং বলতে পারি- তিনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। আমাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁর যে অক্লান্ত শ্রম, ত্যাগ, শাসন ও ভালোবাসা, তার ঋণ শোধ করার ভাষা আমার নেই। আমার ভাই-বোন ও পরিবারই আমার নৈতিক শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয়। আজ যে মূল্যবোধগুলো আঁকড়ে ধরে পথ চলি, তার শেকড় আসলে ঘরের ভেতরেই।
তারপর আসে মক্তবের দিন। আমাদের প্রজন্মের শৈশবে মক্তব শুধু আরবি অক্ষর বা কোরআন শেখার জায়গা ছিল না; সেখানে আদব, শৃঙ্খলা, ভয়, ভালোবাসা- সব একসঙ্গে শেখা হতো। মোতালেব হুজুর ছিলেন অসম্ভব ঠান্ডা মাথার, অমায়িক একজন মানুষ। তাঁর হাত ধরেই আরবি শেখার শুরু। হুসেইন হুজুরকে দেখলেই তখন ভয়ে কাঁপতাম; কিন্তু তাঁর সিপারা পড়ানোর আলাদা একটা ঢং ছিল। তাঁর সময়েই যখন কোরআন নিলাম, তখন গুড়ের সঙ্গে খই মিশিয়ে সবাইকে খাওয়ানোর সেই দৃশ্য আজও মনে পড়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে কত বড় বড় আয়োজন দেখেছি, কিন্তু শৈশবের সেই গুড়-খইয়ের আনন্দের সঙ্গে অনেক কিছুই তুলনা হয় না। লোহাইড় হুজুর মজার মজার কথা বলতেন, আর সেই হাসি-আনন্দের মধ্য দিয়েই কোরআন পড়ার প্রতি এক ধরনের টান তৈরি করেছিলেন। আরও কয়েকজন ছিলেন- যাঁদের হয়তো সব নাম আজ মনে নেই, কিন্তু তাঁদের শেখানো নৈতিকতার ছোট ছোট পাঠ আজও আমার ভেতরে রয়ে গেছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষকের আরেক রূপ দেখলাম। বিভূতি স্যার ছিলেন যেন ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’। একা হাতে কত দায়িত্ব সামলাতেন, অথচ ব্যক্তিত্বে ছিল দৃঢ়তা। তাঁর ধারাবাহিক চেষ্টা আর দায়িত্ববোধ আজ ভাবলে বিস্মিত হই। নারায়ণ স্যার গল্প করে পড়াতেন, আবার ভয়ও দেখাতেন। তাঁর বেতের ভয় এমন ছিল যে পড়া না শিখে স্কুলে যাওয়ার সাহস হতো না। তখন মনে হতো- স্যার এত কড়া কেন! আজ বুঝি, ভয়টুকুর আড়ালেও ছিল আমাদের পড়ার টেবিলে বসিয়ে রাখার এক ধরনের কৌশল। গোপাল স্যার ছিলেন যেন স্কুলের কমান্ডার ইন চিফ; তাঁর কড়া শাসনে আমাদের মতো দুষ্টু ছেলেরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে শিখেছিলাম। ওহাব স্যার ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ- অমায়িক, মৃদুভাষী, সৎ ও সরল। একজন শিক্ষকের ব্যক্তিত্বও যে বইয়ের বাইরে বড় শিক্ষা হতে পারে, তাঁকে দেখে বুঝেছি। সাত্তার স্যার হাতে-কলমে শেখাতে ভালোবাসতেন; তাঁর বিচক্ষণতা ছিল চোখে পড়ার মতো। আর মাওলানা খলিলুর রহমান আমার জীবনের আদর্শদের একজন। তাঁর ধর্মীয় শিক্ষা আমার জীবনের ভিত গড়ে দিয়েছে। প্রাইমারি থেকেই তিনি নামাজের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন। একই গ্রামের হওয়ায় স্কুলের বাইরেও তাঁর নজরদারি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তখন হয়তো বিরক্ত হতাম, আজ কৃতজ্ঞ হই। গোলাম মাওলা স্যারের সততা ও সরলতার কথা আমাদের আগের দশকের শিক্ষার্থীরা ভালোই জানেন। দুই নখের মাঝে কলম দিয়ে শাস্তি দেন- এ কথা শুনেই তাঁকে ভয় করতাম। এখন সেই ভয়ও এক ধরনের মধুর স্মৃতি।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এসে শৈশব ধীরে ধীরে কৈশোরে ঢুকে পড়ল। সঙ্গে বদলে গেল শেখার ধরনও। আমাদের হেড স্যার সামসুদ্দিন সরদার- সুরুজ স্যার নামেই আমরা তাকে চিনতাম- ইংরেজি পড়াতেন আলাদা ঢঙে। এলাকায় যত বিয়েশাদি হতো, স্যারের দাওয়াত প্রায় নিশ্চিত- কারণ তৎকালীন সময়ে বিয়ের গেটে ইংরেজিতে কথা বলার সেরা শিক্ষক হিসেবে তাঁর একটা আলাদা খ্যাতি ছিল। বিষয়টি আজ শুনতে মজার মনে হলেও আমাদের সময়ে এটি ছিল এক ধরনের সামাজিক মর্যাদার গল্প। তাঁর ইংরেজি শেখানোর ধরনও ছিল প্রাণবন্ত।
মুন্সি সাইদুর রহমান স্যার (যাকে সবাই সাজেদার স্যার বলত) সম্পর্কে আমার কাকা, কিন্তু জীবনে তাঁকে ‘স্যার’ ছাড়া অন্য কিছু বলিনি। শিক্ষকের প্রতি যে সম্মান ঘরের সম্পর্কেরও ঊর্ধ্বে যেতে পারে, তাঁর ক্ষেত্রে সেটিই হয়েছে। নিজের কঠোর শ্রম, একাগ্রতা ও আত্মপ্রচেষ্টায় তিনি নিজেকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। হয়তো এলাকার মানুষ তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা সবসময় দিতে পারেনি; কিন্তু ইংরেজি পড়ানোর দক্ষতায় তিনি ছিলেন অনন্য। গিয়াস হুজুরের নৈতিক শিক্ষা ও ইসলামের ইতিহাসের ক্লাস এখনো মনে পড়ে। আশিষ স্যার বিজ্ঞান ও গণিত পড়াতেন এমনভাবে, যেন কঠিন জিনিসও একটু সহজ হয়ে আসে।
আমার হিসাববিজ্ঞানের যাত্রা শুরু প্রিয় বিজয় স্যারের হাত ধরে। ডেবিট আর ক্রেডিট- দুটি শব্দ তখন কত অচেনা ছিল! কিন্তু তাঁর বোঝানোর ভঙ্গি সেই অচেনাকে ধীরে ধীরে আপন করে তুলেছিল। আজ হিসাববিজ্ঞান আমার শিক্ষা ও পেশাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; তাই পেছনে তাকালে বিজয় স্যারের সেই ক্লাসগুলোর মূল্য আরও বেশি করে অনুভব করি। নৃত্যনন্দ স্যারকে না দেখলে হয়তো বুঝতাম না, গ্রামের একটি স্কুলের শিক্ষকও কী অসাধারণ স্মার্ট, পরিপাটি ও ব্যক্তিত্ববান হতে পারেন। আমরা স্যান্ডেল আর গেঞ্জি পরে স্কুলে যাই, আর তিনি নিজের উপস্থিতিতেই যেন শেখাতেন- ব্যক্তিত্বও একটি শিক্ষা। তাঁর বাণিজ্য পড়ানোর ধরন ছিল দারুণ।
প্রশান্ত স্যার ছিলেন কথার জাদুকর। তাঁর বলার ভঙ্গি এমন ছিল যে ক্লাস কখন গল্পে ঢুকে যেত আর গল্প কখন পাঠ হয়ে উঠত, বোঝা যেত না। তাঁর যৌবনের গল্পগুলো এখনো মনে আছে। অমৃত লাল মজুমদার স্যার ছিলেন গণিতের ‘বস’। কী দারুণ ক্যারিশমা! বিশেষ করে অতিরিক্ত জ্যামিতির সমস্যাগুলো করার তাঁর কৌশল এখনো স্মৃতিতে গেঁথে আছে। সত্যেন স্যার ছিলেন অমায়িক ও মানবিক- এখনো মাঝেমধ্যে আমার খোঁজ নেন। তখন বুঝি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক স্কুলের শেষ ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায় না। আর প্রিয় সমর স্যার- হাইস্কুলের নিরেট সরল, ভদ্র একজন মানুষ। তাঁর স্বভাবসুলভ বিনয় আমাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পথে নীরবে প্রভাব ফেলেছে।
কলেজে এসে শিক্ষকদের মধ্যে নতুন এক জগতের সন্ধান পেলাম। সোহরাব স্যারের আমেরিকান স্টাইলে ইংরেজি বলা আমাকে দারুণ আকৃষ্ট করত। ইংরেজির শিক্ষক মরহুম প্রিয় তরুণ স্যার গল্পে গল্পে পড়াতেন; তাঁর ক্লাসের স্মৃতি আজও মনে গেঁথে আছে। বাংলার উৎপল স্যারের প্রমিত বাংলা বলা এবং উদাহরণ দিয়ে পড়ানোর ধরন আমাকে ভাষার সৌন্দর্য চিনতে শিখিয়েছে। প্রকাশ স্যার ছিলেন বাস্তববাদী মানুষ; শিক্ষার্থীকে না বুঝিয়ে তিনি যেন শান্তি পেতেন না- জোর করে হলেও বুঝিয়ে দেওয়ার একটা তাগিদ তাঁর মধ্যে ছিল।
হিসাববিজ্ঞানের গুরু প্রিয় হুমায়ুন স্যার যে দরদ নিয়ে পড়াতেন, তা একজন শিক্ষার্থী হিসেবে অনুভব না করলে বোঝানো কঠিন। বয়স হয়েছে, কত বড় হয়েছি, কিন্তু হুমায়ুন স্যার এখনো আগের মতোই খোঁজ রাখেন। মন্ডল স্যারের শুদ্ধ ভাষায় ডেবিট-ক্রেডিট শেখানো আলাদা করে মনে আছে। নিহার স্যারের ব্যবসায় সংগঠন, মরহুম প্রিয় আনোয়ার স্যারের ব্যবস্থাপনা- এসব পাঠ কেবল পরীক্ষার জন্য ছিল না, পরবর্তী জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। আনোয়ার স্যার ছিলেন আমার বিশেষ প্রিয়। হাসিমাখা মুখের মনোজ স্যার শর্টহ্যান্ড পড়াতেন। প্রণয় স্যার খুব সহজে শিক্ষার্থীদের আপন করে নিতে পারতেন; তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও কৃষিবিজ্ঞানের জ্ঞানের পরিধি সত্যিই বিস্ময়কর ছিল। মোস্তাক স্যারের অমায়িক কথা, সিরাজি ম্যাম, তপতী ম্যাম, গোপাল স্যার, ওসমান স্যার এবং স্বরূপ বাকচীর হিসাববিজ্ঞান শেখানো- সব মিলিয়ে কলেজজীবনের সেই মানুষগুলো আজও আমার স্মৃতির ভেতর জীবন্ত।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন আমাকে সবচেয়ে বেশি শিখিয়েছে- একজন শিক্ষক শুধু শিক্ষক নন, কখনো তিনি অভিভাবক, কখনো বন্ধু, কখনো নিরাপদ আশ্রয়। রোকসানা ম্যামের ব্যক্তিত্বে ছিল এক ধরনের মায়াবী আকর্ষণ- শিক্ষার্থীজীবনের স্মৃতিতে তিনি আলাদা করেই থেকে গেছেন। সাইদুজ্জামান স্যারের জ্ঞানের পরিধি এত বিস্তৃত যে এখনো তাঁর কাছ থেকে শিখি; যদিও তাঁকে ভয় পাওয়ার অভ্যাস পুরোপুরি যায়নি। সালমা ম্যাম আমাকে মায়ের স্নেহে আগলে রাখতেন। একবার পরীক্ষার হলে মাথা ধরে এমন অবস্থা যে লিখতে পারছিলাম না। ম্যাম কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন কী হয়েছে, তারপর দশ মিনিট বাইরে গিয়ে হাঁটতে দিলেন। একটি ছোট্ট মানবিক আচরণ যে একজন শিক্ষার্থীর মনে বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে পারে, সেই ঘটনাই তার প্রমাণ।
প্রিয় আনোয়ার স্যার ছিলেন বাস্তববাদী; কঠিন বিষয় সহজ করে বোঝানো যেন তাঁর স্বভাব। আহসান হাবীব স্যার ছিলেন ঠান্ডা মাথার, বুদ্ধিদীপ্ত শিক্ষক। তাজুল স্যার এত মিশুক ও অমায়িক যে কাছে না গেলে তা বোঝা কঠিন। ফাহিমা ম্যাম অনেক স্নেহ ও ভালোবাসায় আগলে রেখেছিলেন। সুভাষ চন্দ্র শীল স্যারের বিজনেস ল ক্লাস করার পরই মনে হয়েছিল- এই মানুষটি যেন অন্য ধাতুতে তৈরি। অভিনয় চন্দ্র সাহা স্যার ক্লাস সবসময় জমিয়ে রাখতেন। প্রামাণিক স্যারের মেজাজ খুব কড়া ছিল না, কিন্তু তাঁর বিশেষ একরকম হাসি দেখলেই আমরা বুঝতাম- ‘কাজ হয়েছে!’
আব্দুল্লাহ আল হারুন স্যারের কথা বলার ধরন ও ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ। মাজেদ স্যার বিজনেস ম্যাথের মতো কঠিন বিষয় এত সহজ ও সাবলীলভাবে উপস্থাপন করতেন যে ভয় কাটতে সময় লাগত না। সব হিসাব-নিকাশের বাইরেও মানবিক ও সদা হাসিমাখা মুখের মানুষ ছিলেন মায়েনউদ্দিন স্যার। রাশিয়ায় পড়াশোনা করা প্রিয়ব্রত স্যারের ম্যাক্রো ও মাইক্রো ইকোনমিকস পড়ানোও মনে আছে। অকপটে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া সরল মানুষ জাবেদ স্যার, শিক্ষার্থীদের আস্থার বড় জায়গা দিলওয়ারা ম্যাম, আর অ্যাডভান্সড অ্যাকাউন্টিং সুন্দর করে পড়ানো প্রিয় হুমায়ুন স্যার- প্রত্যেকেই আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আলাদা ছাপ রেখে গেছেন। আর হাবিবুর রহমান আকন স্যারের সেই কস্ট অ্যাকাউন্টিং পড়ানোর ধরন এখনো আমি রপ্ত করে আছি।
নিজ বিভাগের শিক্ষক না হয়েও আপনজন হয়ে পাশে ছিলেন ফায়েকুজ্জামান স্যার। অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছেন প্রিয় মরহুম ফারুকুজ্জামান স্যার। প্রিয় বিপুল স্যার, বীথিকা ম্যাম, ভালোবেসে কাছে ডাকা নিখিল স্যার, অনেক ভালোবাসা দেওয়া জুয়েলী ম্যাম- এই মানুষগুলোর স্নেহ, শাসন, উপদেশ আর সাহচর্যই আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে রঙিন করেছে। তাঁরা শুধু আমাকে সনদ অর্জনের পথে এগিয়ে দেননি; তাঁরা আমার ভেতরের মানুষটিকেও গড়ে তুলেছেন।
জীবন অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটেই থেমে থাকে না। ব্যাংকিং জীবনেও আমার অনেক শিক্ষক তৈরি হয়েছেন। আমজাদ ভাই, আশরাফ ভাই, মোসারফ ভাই, মহসিন স্যার, তাহেরা আপু, আব্দুর রহিম ভাই- তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে কাজ, দায়িত্ব, সহকর্মিতা, বাস্তবতা আর মানুষের সঙ্গে আচরণের পাঠ শিখেছি। তখন আরও গভীরভাবে বুঝেছি, ‘শিক্ষক’ আসলে একটি সম্পর্কের নাম; এটি কোনো একটি পদবির মধ্যে আটকে থাকে না।
এরপর নিজে যখন শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হলাম, তখন শিক্ষাকে নতুনভাবে দেখতে শিখলাম। আগে ভাবতাম শিক্ষক শেখান, শিক্ষার্থী শেখে। এখন বুঝি- শিক্ষকও প্রতিদিন শিখে যান। নিজের কর্মস্থলের সম্মানিত সহকর্মীদের কাছ থেকে শিখছি, আর অসংখ্য শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তো শিখছি প্রতিনিয়ত। শিক্ষার্থীর একটি প্রশ্ন কখনো আমাকে নতুন করে পড়তে বাধ্য করে, তাদের একটি ভুল নিজের পড়ানোর পদ্ধতি নিয়ে ভাবায়, আবার তাদের সাফল্য মনে করিয়ে দেয়- একজন শিক্ষকের সামান্য উৎসাহও কখনো একটি জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। তাই আমি এখন প্রায় সব জায়গাকেই নিজের পাঠশালা মনে করি। পরিবার, সহকর্মী, শিক্ষার্থী, বন্ধু, প্রতিবেশী, এমনকি চারপাশের পরিবেশ থেকেও শিখছি- আর শিখে যেতে চাই, ইনশাআল্লাহ।
আমাদের সময়ের বিদ্যালয়জীবনের আরেকটি বাস্তবতা ছিল কঠোর শাসন। কখনো কান ধরানো হয়েছে, কখনো বেঞ্চের নিচে মাথা রেখে বেতের বাড়ি খেয়েছি, কখনো বকাঝকা শুনেছি, কখনো ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আজকের শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের আলোকে শারীরিক শাস্তি সমর্থনযোগ্য নয়- সময় বদলেছে, শিক্ষাদানের ধারণাও বদলেছে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিতে সেই শাসনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষকদের এক ধরনের দায়বোধও। তাঁদের পদ্ধতি সবসময় নিখুঁত ছিল না, কারণ শিক্ষকেরাও মানুষ; তাঁরাও ভুলের ঊর্ধ্বে নন। তাঁদের সব কথা সবসময় শুনেছি, এমন দাবিও করতে পারি না। আমি নিজেও ছিলাম দুষ্টু, দুরন্ত, অবাধ্য। কখনো শাসনে অভিমান করেছি, কখনো মনে মনে রাগও করেছি।
কিন্তু এত বছর পর পেছনে তাকিয়ে যখন দেখি, তখন উপলব্ধি করি- সেই বকুনি, চোখরাঙানি, ভয়, শাসন, প্রশ্রয়, উৎসাহ আর ভালোবাসা- সবকিছুর সম্মিলিত স্পর্শেই গ্রামের দুষ্টু-দুরন্ত ‘টিটো’ ধীরে ধীরে ‘ফায়েকুজ্জামান’ হয়ে উঠেছে। এই রূপান্তর কোনো একজন মানুষের কাজ নয়; এটি অনেক মানুষের সম্মিলিত সাধনা। একজন শিক্ষক হয়তো কোনোদিন জানতেই পারেন না, তাঁর একটি বাক্য, একটি সতর্কতা কিংবা একটি প্রশংসা কোনো শিক্ষার্থীর জীবনে কত বড় প্রভাব ফেলে। শিক্ষকতার এই অদৃশ্য শক্তিই আমাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করে।
জীবনে আমরা অনেক কিছু ভুলে যাই। কোন পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছিলাম, কোন অধ্যায়ের কোন সংজ্ঞা মুখস্থ করেছিলাম, কোন প্রশ্নের উত্তর ভুল হয়েছিল- এসবের অনেকটাই সময়ের সঙ্গে মুছে যায়। কিন্তু শিক্ষককে আমরা অন্যভাবে মনে রাখি। কেউ তাঁর হাসির জন্য, কেউ তাঁর কঠোরতার জন্য, কেউ বোঝানোর ক্ষমতার জন্য, কেউ একটি কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য। একজন ভালো শিক্ষক পাঠ্যসূচি শেষ করেন না শুধু; তিনি শিক্ষার্থীর ভেতরে একটি কণ্ঠ রেখে যান- যে কণ্ঠ তাকে ভুল করতে গেলে থামায়, পড়ে গেলে উঠতে বলে, সাফল্যে বিনয়ী থাকতে শেখায়।
আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আমার জীবনের সব শিক্ষাগুরুর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। যাঁরা আমাকে অক্ষর শিখিয়েছেন, কোরআন শিখিয়েছেন, নামাজের অভ্যাস করিয়েছেন, ইংরেজি, বাংলা, গণিত, বিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, অর্থনীতি কিংবা ব্যবসায় শিক্ষা শিখিয়েছেন; যাঁরা শাসন করেছেন, স্নেহ দিয়েছেন, ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন, বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন- সবার কাছেই আমি ঋণী। যাঁরা আজ আর পৃথিবীতে নেই, মহান আল্লাহ তাঁদের উত্তম প্রতিদান দিন। আর যাঁরা আমাদের মাঝে আছেন, তাঁরা সুস্থ, সম্মানিত ও দীর্ঘ জীবন লাভ করুন।
আমার বিশ্বাস, একজন শিক্ষক শুধু একটি শ্রেণিকক্ষ আলোকিত করেন না; তিনি একটি পরিবার, একটি সমাজ, কখনো একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ আলোকিত করেন। একজন মানুষ যখন আরেকজন মানুষের ভেতরে জ্ঞানের সঙ্গে বিবেক, মূল্যবোধ ও মানবিকতার আলো জ্বালিয়ে দেন- সেখানেই শিক্ষকতার মহত্ত্ব।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমার একটাই প্রার্থনা- পৃথিবীর সব শিক্ষাগুরু ভালো থাকুন। তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা যেন শুধু একটি দিবসের ফুল বা শুভেচ্ছাবার্তায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং তাঁদের শেখানো ভালো মানুষ হওয়ার পাঠ যেন আমাদের প্রতিদিনের জীবনে সত্যি হয়ে ওঠে।
রচনাকাল: ০৫-১০-২০২৬ইং।
আজ ৫ অক্টোবর, বিশ্ব শিক্ষক দিবস। ক্যালেন্ডারে দিনটি বছরে একবার ফিরে আসে; কিন্তু মানুষের জীবনে শিক্ষকের উপস্থিতি কোনো একটি দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। বয়স যত বাড়ে, ততই বুঝি- আমরা আসলে একা একা বড় হই না। আমাদের ভেতরে একটু একটু করে বাস করতে থাকেন অনেক মানুষ। কারও শেখানো একটি অক্ষর, কারও কড়া শাসন, কারও বলা একটি বাক্য, কারও নীরব স্নেহ, কারও সততা, কারও ব্যক্তিত্ব- সব মিলিয়েই গড়ে ওঠে একজন মানুষ। তাই বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমার কাছে শিক্ষককে স্মরণ করা মানে কেবল শ্রেণিকক্ষের শিক্ষককে মনে করা নয়; বরং যাঁরা জীবনটাকে একটু ভালো করে বুঝতে শিখিয়েছেন, তাঁদের সবার সামনে কৃতজ্ঞচিত্তে মাথা নত করা।
আমার শেখার হাতে খড়ি প্রিয় আব্বাজান আর মায়ের কাছে। পৃথিবীতে প্রথম ভাষা, প্রথম আচরণ, প্রথম ভালো-মন্দের বোধ- সবকিছুর শুরু তাঁদের হাত ধরে। আর আমার সহোদর রোকনউজ্জামান আমার জীবনের সেরা শিক্ষকদের একজন নন, বরং বলতে পারি- তিনি আমার জীবনের সবচেয়ে বড় শিক্ষক। আমাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তুলতে তাঁর যে অক্লান্ত শ্রম, ত্যাগ, শাসন ও ভালোবাসা, তার ঋণ শোধ করার ভাষা আমার নেই। আমার ভাই-বোন ও পরিবারই আমার নৈতিক শিক্ষার প্রথম বিদ্যালয়। আজ যে মূল্যবোধগুলো আঁকড়ে ধরে পথ চলি, তার শেকড় আসলে ঘরের ভেতরেই।
তারপর আসে মক্তবের দিন। আমাদের প্রজন্মের শৈশবে মক্তব শুধু আরবি অক্ষর বা কোরআন শেখার জায়গা ছিল না; সেখানে আদব, শৃঙ্খলা, ভয়, ভালোবাসা- সব একসঙ্গে শেখা হতো। মোতালেব হুজুর ছিলেন অসম্ভব ঠান্ডা মাথার, অমায়িক একজন মানুষ। তাঁর হাত ধরেই আরবি শেখার শুরু। হুসেইন হুজুরকে দেখলেই তখন ভয়ে কাঁপতাম; কিন্তু তাঁর সিপারা পড়ানোর আলাদা একটা ঢং ছিল। তাঁর সময়েই যখন কোরআন নিলাম, তখন গুড়ের সঙ্গে খই মিশিয়ে সবাইকে খাওয়ানোর সেই দৃশ্য আজও মনে পড়ে। বয়স বাড়ার সঙ্গে কত বড় বড় আয়োজন দেখেছি, কিন্তু শৈশবের সেই গুড়-খইয়ের আনন্দের সঙ্গে অনেক কিছুই তুলনা হয় না। লোহাইড় হুজুর মজার মজার কথা বলতেন, আর সেই হাসি-আনন্দের মধ্য দিয়েই কোরআন পড়ার প্রতি এক ধরনের টান তৈরি করেছিলেন। আরও কয়েকজন ছিলেন- যাঁদের হয়তো সব নাম আজ মনে নেই, কিন্তু তাঁদের শেখানো নৈতিকতার ছোট ছোট পাঠ আজও আমার ভেতরে রয়ে গেছে।
প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে শিক্ষকের আরেক রূপ দেখলাম। বিভূতি স্যার ছিলেন যেন ‘ওয়ান ম্যান আর্মি’। একা হাতে কত দায়িত্ব সামলাতেন, অথচ ব্যক্তিত্বে ছিল দৃঢ়তা। তাঁর ধারাবাহিক চেষ্টা আর দায়িত্ববোধ আজ ভাবলে বিস্মিত হই। নারায়ণ স্যার গল্প করে পড়াতেন, আবার ভয়ও দেখাতেন। তাঁর বেতের ভয় এমন ছিল যে পড়া না শিখে স্কুলে যাওয়ার সাহস হতো না। তখন মনে হতো- স্যার এত কড়া কেন! আজ বুঝি, ভয়টুকুর আড়ালেও ছিল আমাদের পড়ার টেবিলে বসিয়ে রাখার এক ধরনের কৌশল। গোপাল স্যার ছিলেন যেন স্কুলের কমান্ডার ইন চিফ; তাঁর কড়া শাসনে আমাদের মতো দুষ্টু ছেলেরা সোজা হয়ে দাঁড়াতে শিখেছিলাম। ওহাব স্যার ছিলেন সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রকৃতির মানুষ- অমায়িক, মৃদুভাষী, সৎ ও সরল। একজন শিক্ষকের ব্যক্তিত্বও যে বইয়ের বাইরে বড় শিক্ষা হতে পারে, তাঁকে দেখে বুঝেছি। সাত্তার স্যার হাতে-কলমে শেখাতে ভালোবাসতেন; তাঁর বিচক্ষণতা ছিল চোখে পড়ার মতো। আর মাওলানা খলিলুর রহমান আমার জীবনের আদর্শদের একজন। তাঁর ধর্মীয় শিক্ষা আমার জীবনের ভিত গড়ে দিয়েছে। প্রাইমারি থেকেই তিনি নামাজের ব্যাপারে কঠোর ছিলেন। একই গ্রামের হওয়ায় স্কুলের বাইরেও তাঁর নজরদারি এড়িয়ে যাওয়ার সুযোগ ছিল না। তখন হয়তো বিরক্ত হতাম, আজ কৃতজ্ঞ হই। গোলাম মাওলা স্যারের সততা ও সরলতার কথা আমাদের আগের দশকের শিক্ষার্থীরা ভালোই জানেন। দুই নখের মাঝে কলম দিয়ে শাস্তি দেন- এ কথা শুনেই তাঁকে ভয় করতাম। এখন সেই ভয়ও এক ধরনের মধুর স্মৃতি।
মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে এসে শৈশব ধীরে ধীরে কৈশোরে ঢুকে পড়ল। সঙ্গে বদলে গেল শেখার ধরনও। আমাদের হেড স্যার সামসুদ্দিন সরদার- সুরুজ স্যার নামেই আমরা তাকে চিনতাম- ইংরেজি পড়াতেন আলাদা ঢঙে। এলাকায় যত বিয়েশাদি হতো, স্যারের দাওয়াত প্রায় নিশ্চিত- কারণ তৎকালীন সময়ে বিয়ের গেটে ইংরেজিতে কথা বলার সেরা শিক্ষক হিসেবে তাঁর একটা আলাদা খ্যাতি ছিল। বিষয়টি আজ শুনতে মজার মনে হলেও আমাদের সময়ে এটি ছিল এক ধরনের সামাজিক মর্যাদার গল্প। তাঁর ইংরেজি শেখানোর ধরনও ছিল প্রাণবন্ত।
মুন্সি সাইদুর রহমান স্যার (যাকে সবাই সাজেদার স্যার বলত) সম্পর্কে আমার কাকা, কিন্তু জীবনে তাঁকে ‘স্যার’ ছাড়া অন্য কিছু বলিনি। শিক্ষকের প্রতি যে সম্মান ঘরের সম্পর্কেরও ঊর্ধ্বে যেতে পারে, তাঁর ক্ষেত্রে সেটিই হয়েছে। নিজের কঠোর শ্রম, একাগ্রতা ও আত্মপ্রচেষ্টায় তিনি নিজেকে অনেক উচ্চতায় নিয়ে গিয়েছিলেন। হয়তো এলাকার মানুষ তাঁকে তাঁর প্রাপ্য মর্যাদা সবসময় দিতে পারেনি; কিন্তু ইংরেজি পড়ানোর দক্ষতায় তিনি ছিলেন অনন্য। গিয়াস হুজুরের নৈতিক শিক্ষা ও ইসলামের ইতিহাসের ক্লাস এখনো মনে পড়ে। আশিষ স্যার বিজ্ঞান ও গণিত পড়াতেন এমনভাবে, যেন কঠিন জিনিসও একটু সহজ হয়ে আসে।
আমার হিসাববিজ্ঞানের যাত্রা শুরু প্রিয় বিজয় স্যারের হাত ধরে। ডেবিট আর ক্রেডিট- দুটি শব্দ তখন কত অচেনা ছিল! কিন্তু তাঁর বোঝানোর ভঙ্গি সেই অচেনাকে ধীরে ধীরে আপন করে তুলেছিল। আজ হিসাববিজ্ঞান আমার শিক্ষা ও পেশাজীবনের গুরুত্বপূর্ণ অংশ; তাই পেছনে তাকালে বিজয় স্যারের সেই ক্লাসগুলোর মূল্য আরও বেশি করে অনুভব করি। নৃত্যনন্দ স্যারকে না দেখলে হয়তো বুঝতাম না, গ্রামের একটি স্কুলের শিক্ষকও কী অসাধারণ স্মার্ট, পরিপাটি ও ব্যক্তিত্ববান হতে পারেন। আমরা স্যান্ডেল আর গেঞ্জি পরে স্কুলে যাই, আর তিনি নিজের উপস্থিতিতেই যেন শেখাতেন- ব্যক্তিত্বও একটি শিক্ষা। তাঁর বাণিজ্য পড়ানোর ধরন ছিল দারুণ।
প্রশান্ত স্যার ছিলেন কথার জাদুকর। তাঁর বলার ভঙ্গি এমন ছিল যে ক্লাস কখন গল্পে ঢুকে যেত আর গল্প কখন পাঠ হয়ে উঠত, বোঝা যেত না। তাঁর যৌবনের গল্পগুলো এখনো মনে আছে। অমৃত লাল মজুমদার স্যার ছিলেন গণিতের ‘বস’। কী দারুণ ক্যারিশমা! বিশেষ করে অতিরিক্ত জ্যামিতির সমস্যাগুলো করার তাঁর কৌশল এখনো স্মৃতিতে গেঁথে আছে। সত্যেন স্যার ছিলেন অমায়িক ও মানবিক- এখনো মাঝেমধ্যে আমার খোঁজ নেন। তখন বুঝি, শিক্ষক-শিক্ষার্থীর সম্পর্ক স্কুলের শেষ ঘণ্টায় শেষ হয়ে যায় না। আর প্রিয় সমর স্যার- হাইস্কুলের নিরেট সরল, ভদ্র একজন মানুষ। তাঁর স্বভাবসুলভ বিনয় আমাকে মানুষ হিসেবে গড়ে তোলার পথে নীরবে প্রভাব ফেলেছে।
কলেজে এসে শিক্ষকদের মধ্যে নতুন এক জগতের সন্ধান পেলাম। সোহরাব স্যারের আমেরিকান স্টাইলে ইংরেজি বলা আমাকে দারুণ আকৃষ্ট করত। ইংরেজির শিক্ষক মরহুম প্রিয় তরুণ স্যার গল্পে গল্পে পড়াতেন; তাঁর ক্লাসের স্মৃতি আজও মনে গেঁথে আছে। বাংলার উৎপল স্যারের প্রমিত বাংলা বলা এবং উদাহরণ দিয়ে পড়ানোর ধরন আমাকে ভাষার সৌন্দর্য চিনতে শিখিয়েছে। প্রকাশ স্যার ছিলেন বাস্তববাদী মানুষ; শিক্ষার্থীকে না বুঝিয়ে তিনি যেন শান্তি পেতেন না- জোর করে হলেও বুঝিয়ে দেওয়ার একটা তাগিদ তাঁর মধ্যে ছিল।
হিসাববিজ্ঞানের গুরু প্রিয় হুমায়ুন স্যার যে দরদ নিয়ে পড়াতেন, তা একজন শিক্ষার্থী হিসেবে অনুভব না করলে বোঝানো কঠিন। বয়স হয়েছে, কত বড় হয়েছি, কিন্তু হুমায়ুন স্যার এখনো আগের মতোই খোঁজ রাখেন। মন্ডল স্যারের শুদ্ধ ভাষায় ডেবিট-ক্রেডিট শেখানো আলাদা করে মনে আছে। নিহার স্যারের ব্যবসায় সংগঠন, মরহুম প্রিয় আনোয়ার স্যারের ব্যবস্থাপনা- এসব পাঠ কেবল পরীক্ষার জন্য ছিল না, পরবর্তী জীবনের সঙ্গে মিশে গেছে। আনোয়ার স্যার ছিলেন আমার বিশেষ প্রিয়। হাসিমাখা মুখের মনোজ স্যার শর্টহ্যান্ড পড়াতেন। প্রণয় স্যার খুব সহজে শিক্ষার্থীদের আপন করে নিতে পারতেন; তাঁর অসাধারণ ব্যক্তিত্ব ও কৃষিবিজ্ঞানের জ্ঞানের পরিধি সত্যিই বিস্ময়কর ছিল। মোস্তাক স্যারের অমায়িক কথা, সিরাজি ম্যাম, তপতী ম্যাম, গোপাল স্যার, ওসমান স্যার এবং স্বরূপ বাকচীর হিসাববিজ্ঞান শেখানো- সব মিলিয়ে কলেজজীবনের সেই মানুষগুলো আজও আমার স্মৃতির ভেতর জীবন্ত।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবন আমাকে সবচেয়ে বেশি শিখিয়েছে- একজন শিক্ষক শুধু শিক্ষক নন, কখনো তিনি অভিভাবক, কখনো বন্ধু, কখনো নিরাপদ আশ্রয়। রোকসানা ম্যামের ব্যক্তিত্বে ছিল এক ধরনের মায়াবী আকর্ষণ- শিক্ষার্থীজীবনের স্মৃতিতে তিনি আলাদা করেই থেকে গেছেন। সাইদুজ্জামান স্যারের জ্ঞানের পরিধি এত বিস্তৃত যে এখনো তাঁর কাছ থেকে শিখি; যদিও তাঁকে ভয় পাওয়ার অভ্যাস পুরোপুরি যায়নি। সালমা ম্যাম আমাকে মায়ের স্নেহে আগলে রাখতেন। একবার পরীক্ষার হলে মাথা ধরে এমন অবস্থা যে লিখতে পারছিলাম না। ম্যাম কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন কী হয়েছে, তারপর দশ মিনিট বাইরে গিয়ে হাঁটতে দিলেন। একটি ছোট্ট মানবিক আচরণ যে একজন শিক্ষার্থীর মনে বছরের পর বছর বেঁচে থাকতে পারে, সেই ঘটনাই তার প্রমাণ।
প্রিয় আনোয়ার স্যার ছিলেন বাস্তববাদী; কঠিন বিষয় সহজ করে বোঝানো যেন তাঁর স্বভাব। আহসান হাবীব স্যার ছিলেন ঠান্ডা মাথার, বুদ্ধিদীপ্ত শিক্ষক। তাজুল স্যার এত মিশুক ও অমায়িক যে কাছে না গেলে তা বোঝা কঠিন। ফাহিমা ম্যাম অনেক স্নেহ ও ভালোবাসায় আগলে রেখেছিলেন। সুভাষ চন্দ্র শীল স্যারের বিজনেস ল ক্লাস করার পরই মনে হয়েছিল- এই মানুষটি যেন অন্য ধাতুতে তৈরি। অভিনয় চন্দ্র সাহা স্যার ক্লাস সবসময় জমিয়ে রাখতেন। প্রামাণিক স্যারের মেজাজ খুব কড়া ছিল না, কিন্তু তাঁর বিশেষ একরকম হাসি দেখলেই আমরা বুঝতাম- ‘কাজ হয়েছে!’
আব্দুল্লাহ আল হারুন স্যারের কথা বলার ধরন ও ব্যক্তিত্ব ছিল অসাধারণ। মাজেদ স্যার বিজনেস ম্যাথের মতো কঠিন বিষয় এত সহজ ও সাবলীলভাবে উপস্থাপন করতেন যে ভয় কাটতে সময় লাগত না। সব হিসাব-নিকাশের বাইরেও মানবিক ও সদা হাসিমাখা মুখের মানুষ ছিলেন মায়েনউদ্দিন স্যার। রাশিয়ায় পড়াশোনা করা প্রিয়ব্রত স্যারের ম্যাক্রো ও মাইক্রো ইকোনমিকস পড়ানোও মনে আছে। অকপটে নিজের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নেওয়া সরল মানুষ জাবেদ স্যার, শিক্ষার্থীদের আস্থার বড় জায়গা দিলওয়ারা ম্যাম, আর অ্যাডভান্সড অ্যাকাউন্টিং সুন্দর করে পড়ানো প্রিয় হুমায়ুন স্যার- প্রত্যেকেই আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে আলাদা ছাপ রেখে গেছেন। আর হাবিবুর রহমান আকন স্যারের সেই কস্ট অ্যাকাউন্টিং পড়ানোর ধরন এখনো আমি রপ্ত করে আছি।
নিজ বিভাগের শিক্ষক না হয়েও আপনজন হয়ে পাশে ছিলেন ফায়েকুজ্জামান স্যার। অভিভাবকের মতো আগলে রেখেছেন প্রিয় মরহুম ফারুকুজ্জামান স্যার। প্রিয় বিপুল স্যার, বীথিকা ম্যাম, ভালোবেসে কাছে ডাকা নিখিল স্যার, অনেক ভালোবাসা দেওয়া জুয়েলী ম্যাম- এই মানুষগুলোর স্নেহ, শাসন, উপদেশ আর সাহচর্যই আমার বিশ্ববিদ্যালয় জীবনকে রঙিন করেছে। তাঁরা শুধু আমাকে সনদ অর্জনের পথে এগিয়ে দেননি; তাঁরা আমার ভেতরের মানুষটিকেও গড়ে তুলেছেন।
জীবন অবশ্য বিশ্ববিদ্যালয়ের গেটেই থেমে থাকে না। ব্যাংকিং জীবনেও আমার অনেক শিক্ষক তৈরি হয়েছেন। আমজাদ ভাই, আশরাফ ভাই, মোসারফ ভাই, মহসিন স্যার, তাহেরা আপু, আব্দুর রহিম ভাই- তাঁদের প্রত্যেকের কাছ থেকে কাজ, দায়িত্ব, সহকর্মিতা, বাস্তবতা আর মানুষের সঙ্গে আচরণের পাঠ শিখেছি। তখন আরও গভীরভাবে বুঝেছি, ‘শিক্ষক’ আসলে একটি সম্পর্কের নাম; এটি কোনো একটি পদবির মধ্যে আটকে থাকে না।
এরপর নিজে যখন শিক্ষকতার সঙ্গে যুক্ত হলাম, তখন শিক্ষাকে নতুনভাবে দেখতে শিখলাম। আগে ভাবতাম শিক্ষক শেখান, শিক্ষার্থী শেখে। এখন বুঝি- শিক্ষকও প্রতিদিন শিখে যান। নিজের কর্মস্থলের সম্মানিত সহকর্মীদের কাছ থেকে শিখছি, আর অসংখ্য শিক্ষার্থীর কাছ থেকে তো শিখছি প্রতিনিয়ত। শিক্ষার্থীর একটি প্রশ্ন কখনো আমাকে নতুন করে পড়তে বাধ্য করে, তাদের একটি ভুল নিজের পড়ানোর পদ্ধতি নিয়ে ভাবায়, আবার তাদের সাফল্য মনে করিয়ে দেয়- একজন শিক্ষকের সামান্য উৎসাহও কখনো একটি জীবনের গতিপথ বদলে দিতে পারে। তাই আমি এখন প্রায় সব জায়গাকেই নিজের পাঠশালা মনে করি। পরিবার, সহকর্মী, শিক্ষার্থী, বন্ধু, প্রতিবেশী, এমনকি চারপাশের পরিবেশ থেকেও শিখছি- আর শিখে যেতে চাই, ইনশাআল্লাহ।
আমাদের সময়ের বিদ্যালয়জীবনের আরেকটি বাস্তবতা ছিল কঠোর শাসন। কখনো কান ধরানো হয়েছে, কখনো বেঞ্চের নিচে মাথা রেখে বেতের বাড়ি খেয়েছি, কখনো বকাঝকা শুনেছি, কখনো ক্লাস থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। আজকের শিক্ষা-মনোবিজ্ঞানের আলোকে শারীরিক শাস্তি সমর্থনযোগ্য নয়- সময় বদলেছে, শিক্ষাদানের ধারণাও বদলেছে। কিন্তু আমার ব্যক্তিগত স্মৃতিতে সেই শাসনের সঙ্গে জড়িয়ে আছে শিক্ষকদের এক ধরনের দায়বোধও। তাঁদের পদ্ধতি সবসময় নিখুঁত ছিল না, কারণ শিক্ষকেরাও মানুষ; তাঁরাও ভুলের ঊর্ধ্বে নন। তাঁদের সব কথা সবসময় শুনেছি, এমন দাবিও করতে পারি না। আমি নিজেও ছিলাম দুষ্টু, দুরন্ত, অবাধ্য। কখনো শাসনে অভিমান করেছি, কখনো মনে মনে রাগও করেছি।
কিন্তু এত বছর পর পেছনে তাকিয়ে যখন দেখি, তখন উপলব্ধি করি- সেই বকুনি, চোখরাঙানি, ভয়, শাসন, প্রশ্রয়, উৎসাহ আর ভালোবাসা- সবকিছুর সম্মিলিত স্পর্শেই গ্রামের দুষ্টু-দুরন্ত ‘টিটো’ ধীরে ধীরে ‘ফায়েকুজ্জামান’ হয়ে উঠেছে। এই রূপান্তর কোনো একজন মানুষের কাজ নয়; এটি অনেক মানুষের সম্মিলিত সাধনা। একজন শিক্ষক হয়তো কোনোদিন জানতেই পারেন না, তাঁর একটি বাক্য, একটি সতর্কতা কিংবা একটি প্রশংসা কোনো শিক্ষার্থীর জীবনে কত বড় প্রভাব ফেলে। শিক্ষকতার এই অদৃশ্য শক্তিই আমাকে সবচেয়ে বেশি বিস্মিত করে।
জীবনে আমরা অনেক কিছু ভুলে যাই। কোন পরীক্ষায় কত নম্বর পেয়েছিলাম, কোন অধ্যায়ের কোন সংজ্ঞা মুখস্থ করেছিলাম, কোন প্রশ্নের উত্তর ভুল হয়েছিল- এসবের অনেকটাই সময়ের সঙ্গে মুছে যায়। কিন্তু শিক্ষককে আমরা অন্যভাবে মনে রাখি। কেউ তাঁর হাসির জন্য, কেউ তাঁর কঠোরতার জন্য, কেউ বোঝানোর ক্ষমতার জন্য, কেউ একটি কঠিন সময়ে পাশে দাঁড়ানোর জন্য। একজন ভালো শিক্ষক পাঠ্যসূচি শেষ করেন না শুধু; তিনি শিক্ষার্থীর ভেতরে একটি কণ্ঠ রেখে যান- যে কণ্ঠ তাকে ভুল করতে গেলে থামায়, পড়ে গেলে উঠতে বলে, সাফল্যে বিনয়ী থাকতে শেখায়।
আজ বিশ্ব শিক্ষক দিবসে তাই আমার জীবনের সব শিক্ষাগুরুর প্রতি বিনম্র শ্রদ্ধা ও কৃতজ্ঞতা জানাই। যাঁরা আমাকে অক্ষর শিখিয়েছেন, কোরআন শিখিয়েছেন, নামাজের অভ্যাস করিয়েছেন, ইংরেজি, বাংলা, গণিত, বিজ্ঞান, হিসাববিজ্ঞান, অর্থনীতি কিংবা ব্যবসায় শিক্ষা শিখিয়েছেন; যাঁরা শাসন করেছেন, স্নেহ দিয়েছেন, ভুল ধরিয়ে দিয়েছেন, বিপদে পাশে দাঁড়িয়েছেন- সবার কাছেই আমি ঋণী। যাঁরা আজ আর পৃথিবীতে নেই, মহান আল্লাহ তাঁদের উত্তম প্রতিদান দিন। আর যাঁরা আমাদের মাঝে আছেন, তাঁরা সুস্থ, সম্মানিত ও দীর্ঘ জীবন লাভ করুন।
আমার বিশ্বাস, একজন শিক্ষক শুধু একটি শ্রেণিকক্ষ আলোকিত করেন না; তিনি একটি পরিবার, একটি সমাজ, কখনো একটি প্রজন্মের ভবিষ্যৎ আলোকিত করেন। একজন মানুষ যখন আরেকজন মানুষের ভেতরে জ্ঞানের সঙ্গে বিবেক, মূল্যবোধ ও মানবিকতার আলো জ্বালিয়ে দেন- সেখানেই শিক্ষকতার মহত্ত্ব।
বিশ্ব শিক্ষক দিবসে আমার একটাই প্রার্থনা- পৃথিবীর সব শিক্ষাগুরু ভালো থাকুন। তাঁদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা যেন শুধু একটি দিবসের ফুল বা শুভেচ্ছাবার্তায় সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং তাঁদের শেখানো ভালো মানুষ হওয়ার পাঠ যেন আমাদের প্রতিদিনের জীবনে সত্যি হয়ে ওঠে।
রচনাকাল: ০৫-১০-২০২৬ইং।
মন্তব্য করুন