[পর্ব: ০১/০২]
রাহুল বাইকটা নিয়ে ছুটল বৃষ্টিভেজা পিচঢালা পথে। হাতের আঙুল দিয়ে সে শক্তভাবে চেপে ধরেছিল স্টিয়ারিং। চারিদিকে ভীষণ অন্ধকার, তবে মাঝে মাঝে মেঘের গর্জনে অন্ধকার শহরে আলোর ঝলকানি দেখা যাচ্ছিল।
বৃষ্টির ফোঁটাগুলো তার চোখ ও মুখের উপর এসে পড়ছিল, সমস্ত শরীরটা তার বরফের মতো ঠাণ্ডা হয়ে গেছে, তবুও সে কোথাও একটুখানি থেমে বিশ্রাম নেয়নি। ঐশীর ফোনকলটি যেন এসবের কোনোটাই তাকে অনুভব করতে দেয়নি।
মেঘের গর্জন ও বৃষ্টির টিপটিপ শব্দ ছাড়া পুরো শহরটি ছিল একদম নীরব। কোথাও একটা মানুষকেও বের হতে দেখা যায়নি, যে রাতে গাছের ডালে হুতুমপেঁচাকে বসে থাকতে দেখা যেত, সেও যেন আজ কোনো এক গাছের বাকলের আড়ালে লুকিয়ে বৃষ্টি থামার অপেক্ষা করছে। মাঝেমধ্যে বাতাসের গতিবেগে চলন্ত বাইকটাকে সে কন্ট্রোলও করতে পারছিল না।
এরই মধ্যে সে ঢুকে পড়ল ঐশীদের এলাকায়। পুরনো কলোনি- রাস্তার ল্যাম্পপোস্টের লাইটগুলোও জ্বলছে না। চারপাশ থেকে শুধু শোনা যাচ্ছে মেঘের গর্জন ও বৃষ্টির টুপটাপ শব্দ। আর দূরে কোথাও কোনো ঘর থেকে পালিত কিছু কুকুরের অস্পষ্ট ঘেউ ঘেউ শব্দ শোনা যাচ্ছিল।
বুকের ভেতর তার অজানা এক শঙ্কা সেঁধিয়ে গেল। যখন সে ঐশীদের বিল্ডিংয়ের সামনে এসে দাঁড়াল, ঠিক তখনই সে মনে মনে ভাবল- হয়তো কিছু একটাতে ভুল হচ্ছে।
বিল্ডিংয়ের সামনে কোনো সিকিউরিটি গার্ডও ছিল না। সাধারণত ওরা সবসময় বসে থাকত একটা ছাউনির নিচে- কিন্তু আজ রাতে সেই ছাউনিটাও ছিল খালি। রাহুল বাইকটা পার্ক করে বৃষ্টির মধ্যেই দৌড় দিল বিল্ডিংয়ের দিকে।
সিঁড়ির ধাপে ধাপে বৃষ্টির পানি জমে ছিল। পায়ের জুতোজোড়া তার পানি লাগার কারণে সিঁড়ির ধাপের সাথে চুম্বকের মতোই আটকে যাচ্ছিল, এরপরও সে একের পর এক ধাপে পা ফেলছিল।
ঐশীর ফ্ল্যাটটা ছিল তৃতীয় তলায়। দম আটকানো এক উৎকণ্ঠা নিয়ে রাহুল ধীরে ধীরে সিঁড়ি বেয়ে উঠছিল আর জোরে জোরে হাঁপানো নিঃশ্বাস ছাড়ছিল।
তৃতীয় তলায় পৌঁছেই সে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঐশীর ফ্ল্যাটের দরজাটা একটুখানি খোলা ছিল! দরজার ফাঁক দিয়ে সে কেমন এক অদ্ভুত আলো দেখতে পেল, যে আলো কোনোদিনও সে দেখেনি। সে কি এক ম্লান কম্পিত আলো।
রাহুলের গলা শুকিয়ে গেল। মনে হচ্ছিল কে যেন তার নিঃশ্বাসটাকে আটকে ধরেছে। একবার সে ভাবল- কিছু একটা হয়তো ভুল করছি, না হলে এটা স্বাভাবিক কিছু। নয়তো ঐশী হয়তো ভুল করেই দরজাটা বন্ধ করতে ভুলে গেছে। কিন্তু তার মন বলছে- না, এর মাঝে নিশ্চয়ই ভয়ংকর কিছু রহস্য লুকিয়ে থাকতে পারে।
রাহুল ধীরে ধীরে দরজার সামনে এগিয়ে গেল। ভেতর থেকে কোনো সাড়াশব্দ শোনা যাচ্ছিল না। শুধু বাইরে বৃষ্টির শব্দ আর এদিকে তার নিজের হৃৎস্পন্দন।
ভয় তাকে কিছুতেই দমিয়ে রাখতে পারেনি, ধীরে ধীরে সে হাত বাড়িয়ে দরজায় ধাক্কা দিল।
ক্যাঁচ করে দরজাটার দুটি পাল্লাই পুরোপুরি খুলে গেল। ভেতরের দৃশ্য দেখে সে থমকে গেল। পুরো ফ্ল্যাটটাই সালফারের দুর্গন্ধে ভরে গেছে। যেন কোনো কিছু পুড়ছে অথবা ফ্ল্যাটে কোনো ক্লিনার কেমিক্যাল ব্যবহার হয়েছে। ড্রয়িংরুমের সমস্ত জিনিসপত্র এলোমেলো হয়ে আছে। সোফার এক কোণে পড়ে আছে ঐশীর গায়ের সাদা চাদরটি, যেটা সে প্রায়ই ব্যবহার করত।
কিন্তু ঐশী নেই।
রাহুল এবার একটু উঁচু গলায় ডাক দিল-
“ঐশী…? ঐশী তুমি কোথায়?”
কোনো সাড়াশব্দ সে শুনতে পেল না। শুধু নিজেরই গলার থমথমে ফিরতি প্রতিধ্বনিটাই সে শুনতে পাচ্ছিল।
ঠিক কিছুক্ষণ পরেই ভেতরের একটি রুম থেকে সে অদ্ভুত এক আওয়াজ শুনতে পায়- যেন কেউ একজন কখনো কাঁদছে আবার কখনো হাসছে। যা ঠিক সে আন্দাজও করতে পারছিল না।
তবুও সে সাহস করে এগিয়ে গেল রুমের ভেতরের দিকে। বিচলিত মনে শুধু ঐশীকেই সে খুঁজছিল।
কিন্তু ঐশী কোথায়? আর এত রাতে ঐশী তার রুম থেকে কোথায়ই বা যেতে পারে? এসব তার কোনোটাই স্বাভাবিক মনে হচ্ছে না।
(চলমান….)
রচনাকাল: ৩১-০৮-২০২৬ইং।
মন্তব্য করুন