‘ইউনিভার্সিটি’ মানেটা কী, তা ঠিক আমি জানি না, কলেজটা কেমন সেটাও ঠিক বুঝি না। তবে হাইস্কুল ও প্রাইমারি বিষয় সম্পর্কে কমবেশি কিছুটা হলেও বুঝি। কেননা হাইস্কুল ও প্রাইমারিতে পড়েছি বলে সে সম্পর্কে জানতে শিখেছি।
‘ইউনিভার্সিটি ও কলেজ’ এ দুটি বিষয় নিয়ে যদিও আমি এতটুকুও বুঝি না বা জানি না, তবুও কেউ যদি তার প্রসঙ্গে কোনো কিছুর বিষয় ধরে আলোচনা করেন, সেক্ষেত্রে কিছুটা হলেও সেসবের রহস্যটা উপলব্ধি করতে পারি। এছাড়া কোনো মুহূর্তে যদি ইউনিভার্সিটি ও কলেজের চারপাশের পরিবেশগুলোর দিকে একবার দৃষ্টি রাখি, তবে তারই অনুভবে ইত্যাদি সকল বিবরণের নমুনাগুলি খুব সহজেই বলতে পারি।
এমন কথাগুলো শুনে হয়তো কেউ কেউ ভাবছেন- একজন হাইস্কুল পর্যন্ত পড়ুয়া হয়ে এত কিছুর বিশ্লেষণ আমি কীভাবে করছি! আর যে যাই ভাবুন, তবে হ্যাঁ, এ ব্যাপারে সবকিছু জানার একটাই কারণ ছিল, ইউনিভার্সিটি ও কলেজের কিছু বন্ধু-বান্ধবের সঙ্গে আমার যথেষ্ট ভালো সম্পর্ক ছিল বলে।
আর সেই সূত্রে তাদেরই জীবনে ঘটে যাওয়া কিছু দুঃখজনক ইতিহাস ঘটেছিল বলে সেসব বিষয়ের ওপর কিছু আলোচনা নিম্নবর্ণিত লেখায় তুলে ধরার চেষ্টা করব। সেই সাথে অনুগ্রহপূর্বক আপনারা সবাই গল্পটির শেষ লাইন পর্যন্ত সাথেই থাকবেন।
ছোটবেলা থেকেই মা-বাবা এবং বড় ভাই ও বোনেরা অনেক মারধর করে গ্রামের সেই পুরোনো প্রাইমারি স্কুলটিতে পাঠাতেন। কখনো আমি স্কুলে যেতে না চাইলেও তাঁরা আমায় জোরপূর্বক পাঠিয়ে দিতেন। একেকটা সময় আমার খুব খারাপ লেগেছিল, আবার কোনো এক সময় খুব ভালোও লাগত। প্রাইমারি স্কুলে পড়ার সময় কয়েকজন সহপাঠী ছিল, তারা সকলেই ছিল যথেষ্ট ভালো স্বভাবের ও নম্র ব্যবহারের। প্রায় সময়টাই তাঁরা আমাকে বুঝিয়ে বলত-
“পড়ালেখাগুলো ঠিকঠাকভাবে না করলে অন্যের ক্ষেতে হালচাষ করতে হবে- বুঝলি?”
আর আমি ওদের ওই কথাটির ওপর ভেবে এতটাই অসহ্য বোধ সহে প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে, যত কষ্টই হোক আমাকে আমার পড়ার লক্ষ্যে যেভাবেই হোক অন্তিম প্রান্তে পৌঁছাতে হবে। ভাবনার কিছুদিন পর থেকে আমার পরিবারের কাউকে আর আগের মতো শাসন করে স্কুলে পাঠাতে হতো না। নিজের ইচ্ছা মতোই আমি আমার বই-খাতাগুলো গুছিয়ে তাড়াহুড়ো করে স্কুলে চলে যেতাম এবং সবার আগেই শ্রেণিকক্ষে গিয়ে উপস্থিত হতাম। আমার এই দ্রুতগামী প্রতিভার আগ্রহগুলো দেখে স্কুলের শিক্ষক থেকে শুরু করে সকল সহপাঠীরাই আমাকে অত্যন্ত ভালোবাসতে শুরু করেছিল। এছাড়া পাশাপাশি আমি প্রতিটি বার্ষিক পরীক্ষায় বেশ ভালো ফলাফল অর্জন করে জীবনের একেকটি ধাপও পার করেছিলাম। প্রাইমারি পড়া শেষ করে ভর্তি হয়েছিলাম আমার বাড়ি থেকে আধা কিলোমিটার দূরত্বে অবস্থিত নামকরা একটি হাইস্কুলে।
হাইস্কুলে নতুন ভর্তি হওয়ার পর প্রথমে প্রথমে আমার ভীষণ খারাপ লেগেছিল, তবে পরে সেই খারাপ মনোভাবটা ধীরে ধীরে কেটে গিয়েছিল। বন্ধু-বান্ধবদের সঙ্গে আড্ডা দেওয়ার মজাটাই ছিল অন্যরকম। যখন আমি নবম শ্রেণির ছাত্র ছিলাম, ঠিক ওই সময়ে আমার স্কুলেরই একজন সহকারী শিক্ষক আমার বেঞ্চটির সামনে এসে হাস্যকর ভাষায় বললেন-
“আচ্ছা আশিক, তুমি কি এভাবেই শুধু শুধু কলম ও খাতাটি নিয়ে সারাক্ষণ বসে থাকো, নাকি…?”
সহকারী শিক্ষকের উক্ত প্রশ্নের উত্তরে আমি বললাম-
“স্যার, আমি যদি আমার কলম ও খাতাটি নিয়ে শুধু সারাক্ষণ বসে থাকতাম, তবে কি আর আপনাদের দেওয়া পাঠ্যপুস্ত্রকের অধ্যায়গুলো দৈনিক ঠিকঠাকভাবে বুঝিয়ে দিতে পারতাম? বলুন তো দেখি স্যার?”
“তা অবশ্য তুমি এক হিসেবে কথাটি মন্দও বলোনি! তবুও কেন জানি তোমাকে নিয়ে আমার মাঝেমধ্যে ভাবনা হয়, আচ্ছা বলো তো- তুমি পড়ো কখন শুনি?”
“স্যার, পড়ার টেবিলটায় যখন আমি বসি, ঠিক ওই সময়ে আমি আমার পাঠ্য বইয়ের পড়াগুলো যথার্থ মনোযোগী হয়েই পড়তে থাকি।”
স্কুলের সকল শিক্ষকের এরকম বিভিন্ন ধরনের কিছু প্রশ্নের উত্তরগুলো আমি এভাবেই জানিয়ে দিয়েছিলাম। পড়ালেখার পাশাপাশি লেখালেখির অভ্যাসটিও ছিল আমার যথেষ্ট প্রিয়। এমতাবস্থায় আমি নবম শ্রেণির বার্ষিক পরীক্ষার ফলাফলটিও বেশ ভালোই করেছিলাম। দশম শ্রেণি আর আমাকে ঠিকমতো পড়তে দেয়নি। এ জীবনের গোছানো আশা-ভরসাগুলো যা কিছু ছিল, সবই তা হঠাৎ একটা বড় ঝড় এসে বন্যায় সম্পূর্ণ ভাসিয়ে নিয়ে গেছে অথৈ জলের অজানা সীমান্তে! সেই বন্যার অথৈ জলের ওপর ভেসে থাকার মতো সুখ-শান্তিটুকুও ছিল না। জলের উথাল-পাতাল ঢেউ তরঙ্গ আমায় ঠেলে পৌঁছে দিয়েছিল দশমে চলে আসা একটি নারীর ঠিকানায়! যার কারণে আজও আমি কলেজ পর্যন্ত পৌঁছাতে পারিনি। এই অদ্ভুত অন্তরটি শুধু একটিমাত্র নারীর অবুঝ ভালোবাসার মায়াজালে আটকে গিয়েছিল। সেই থেকে তাকে নিয়েই আমি আমার জীবনের প্রতিটি স্তর ধাপে ধাপে সাজাতে শুরু করেছিলাম। তাঁরই অধীর ঘনঘোর প্রেমের কারণে একেকটা সময় পড়ালেখাটা কী জিনিস, সেটিও আমি ভুলে গিয়েছিলাম। একটা সময় ঠিকই ভেবে নিয়েছিলাম যে, এ জীবনে পড়ালেখা করে কী আর হবে! এমনি বিভিন্ন ধরনের আজগুবি বাজে চিন্তাভাবনাগুলো এ বদ্ধ অন্তরটিতে পুষে শুধু তাঁরই পিছে আমি আমার অলস সকাল ও ক্লান্ত জীবনের দিন-রাতগুলো অনায়েসে ব্যয় করেছিলাম। এমতাবস্থায় হঠাৎ একদিন তাঁরই ভালোবাসার মায়াজালে বিবাহবন্ধনে নিজেকে বন্দিশালায় আবদ্ধ করে ফেললাম। এবং তাঁর সাথেই শুরু হলো আমার/আমাদের নতুন সংসার জীবন।
কোনো একটা সময় এটিও কখনো ভাবিনি যে, ভবিষ্যতে আমরা দুজনে কী করব। আজ না হয় বাবার আছে বলেই তাঁর খাচ্ছি! দুদিন পর যখন বাবাও বলে দেবেন, তোমাদের মতো তোমরা কিছু একটা করে খাও, তখন আমরা কী করব, সেটিও বড় ভাবনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছিল। অথচ এমন চিন্তাভাবনাগুলো কখনোই আমরা করিনি। ঠিকানাবিহীন ভালোবাসার মোহে পড়ে আমরা দুজনে স্বপ্নের এক অচেনা দেশে হারিয়ে গিয়েছিলাম। এই অন্ধ ভালোবাসার রূপ এখন আর আমাদের দুজনের হৃদয়ের গভীরে এতটুকুও নেই! অবশ্য ভালোবাসা না থাকার কারণটিও ছিল একমাত্র অভাবের জন্য। অভাবে পড়লে যেমন জোটে, সেরকমটাই ঘটেছিল! জীবনের সুন্দর মুহূর্তগুলো অপচয় করার কারণেই সেও আজ এই অন্ধ ভালোবাসার প্রিয় মানুষটিকে অনেক দূরে সরিয়ে রেখেছে। দুজনের মাঝে যোগাযোগ ছিল বিচ্ছিন্ন। দুটি অন্তরে ছিল না যত্ন করে রেখে দেওয়ার পুরোনো মুগ্ধময় বাক্যের ভাষাগুলিও! দুচোখের দৃষ্টি যেদিকেই পড়েছিল, যেন মনে হয়েছিল ধুমড়ে-মুচড়ে পড়ে আছে শুধু বিচ্ছিন্নতার চিহ্নগুলো। আজও অনেক দূরে অবস্থান করছি। তবে হ্যাঁ, তবুও আমি তাকে ছাড়া নতুন কিছু বন্ধুদের নিয়ে মোটামুটি যথেষ্ট ভালোই রয়েছি।
আমার মতো সেইসব বন্ধুদের জীবনেও ঘটে গিয়েছিল তেমনি ধরনের দুঃখজনক বিভিন্ন কাহিনির ইতিহাস। তাদের ওইসব দুঃখজনক কাহিনিগুলো মাঝেমধ্যে আমি খুব মনোযোগ দিয়ে শুনতাম। এবং পরবর্তী সময়ে সেইসব কাহিনিগুলো আমি আমার কালি ভর্তি একটি কলম দ্বারা লিপিবদ্ধ করে রাখতাম পুরোনো একটি ছেঁড়া পাতার ডায়েরিতে। তেমনি একজন বন্ধু, তাঁরও জীবনে ঘটেছিল গোপনীয় কিছু ইতিহাস- যা আমি তাঁরই আপন মুখে শুনেছিলাম। আর সেটারই কিছু ইতিহাস এই গল্পের আলোচনায় তুলে ধরেছি-
সেই বন্ধুটি যখন সরকারি কলেজে পড়ালেখা করছিল, আমাদের দুজনের মতো অন্ধ ভালোবাসায় আসক্ত হয়ে অন্য একটি নারী তাঁর জীবনেও এসে ধরা দিয়েছিল। তবে ওই নারীটির মূল উদ্দেশ্যটি ছিল কোনো স্বার্থ হাসিল করা। তবে হ্যাঁ, তাঁর সেই মূল স্বার্থটি ছিল শুধু অর্থের। অর্থকে সে খুব বেশিই ভালোবাসত। এমতাবস্থায় একটা সময় আমার বন্ধুটি মনে করে বসল, বোধহয় ওর পরিবারের সাংসারিক কোনো বিষয়ে এই অর্থগুলোর প্রয়োজন ছিল। এটাই মনে করে আমার বন্ধুটি সেই নারীটিকে যথেষ্ট সাহায্য-সহযোগিতা করতে লেগে পড়ল। এবং একটা সময় সে এই সুযোগে ভেবেই নিয়েছিল যে, যদি তাকে এভাবে সাহায্য-সহযোগিতাগুলো করা যেতে পারে, তবে তো সার্থকের খাতায় নিজেকে লিপিবদ্ধ করে ধন্য মনে করা যেতে পারে! কিন্তু এসব বিষয়ের সব কিছুতেই ছিল আমার বন্ধুটির ভুল চিন্তাভাবনা। কিছুদিন পর যখন সে বুঝতে পেরেছিল যে, লোভী নারীটি তাঁর স্বার্থ হাসিল করার জন্যই ওর কাছ থেকে নেওয়া সমস্ত অর্থগুলো নিজের ব্যাংক অ্যাকাউন্টে জমিয়েছিল, ঠিক পরক্ষণই আমার সেই বন্ধুটিকে চিরদিনের জন্য ওই নারীটি নমস্কার জানিয়ে চলে গিয়েছিল!
এর মাঝে আরও কিছু সত্য ঘটনা লুকিয়ে ছিল, তবে সেগুলো লিখে বললে হয়তো আমার এই ভরা কলমটির কালিগুলো শেষও হয়ে যেতে পারে! এছাড়া ওইসব বিষয়ের কথাগুলো যদিও এখানে লিখতে যাই, তবে তা লিখেও শেষ করা অসম্ভব বলে মনে করছি। তবে ওইসব ঘটনার সত্য কাহিনিগুলো পরে কোনো একদিন অবসর সময় পেলে তা অবশ্যই আপনাদের সামনে ধৈর্য সহকারে লিখে তুলে ধরব। যাই হোক, চলমান এইসব সত্য কাহিনিগুলো হয়তোবা কারও কাছে পড়তে খারাপ লাগছে! আবার কারও কাছে হয়তোবা ভালোও লাগছে! তবে যাদের কাছে ভালো লাগছে, তাদের জন্যই বলছি, চলুন অন্য আরেকটি বন্ধুর জীবন ডায়েরির পাতায় চলে যাই!
বাবার একমাত্র ছেলে ছিল আশিক। বাংলাদেশে ইউনিভার্সিটি শেষ করেই সে উন্নত পড়ালেখা করার জন্য বাইরের দেশে চলে গিয়েছিল। ওখানে গিয়ে কিছুদিনের মধ্যেই পরিচয় হয়েছিল বাংলাদেশেরই কোনো একটি জেলার সুন্দরী একজন নারীর সঙ্গে। সুন্দরী সেই নারীটির নাম ছিল মীম। মিষ্টি মধুর মুখের ভাষাগুলো শুনতে পেয়ে আশিকও হারিয়ে গিয়েছিল মীমের ছলনাময়ী ভালোবাসায়! দুজনেই কোনোমতেই তাদের পড়ার ধাপগুলো সমাপ্তি করেছিল। এরই মধ্যে হঠাৎ কোনো একদিন তাঁরা দুজনই ফিরে এসেছিল নিজ জন্মভূমি বাংলাদেশের মাটিতে। নিজের দেশে ফিরেই কিছুদিন পর বাবা-মায়ের অবাধ্য হয়ে নিজ নিজ ইচ্ছায় তাঁরা দুজনই বিবাহ সম্পন্ন করে নিয়েছিল। কিন্তু ওরাও কখনো ভেবে দেখেনি যে, তাঁদের তো কোনো পেশাগত কর্মটিও ছিল না! তবে এটুকুই শুধু তখন ভেবেছিল, তাঁরা তো উচ্চশিক্ষিত, তার জন্য হয়তো নিজের দেশেই কোনো না কোনো একটা উপায় খুঁজে নিয়ে সুখ-শান্তিতেই জীবন অতিবাহিত করতে পারবে। বিয়ের পর তাঁরা নিজের পরিবার ছেড়ে দূরে কোথাও সংসার সাজিয়ে নিয়েছিল। এমতাবস্থায় হঠাৎ তাঁরা একটা কর্মেরও সুব্যবস্থা করে নিয়েছিল! দুজনের মাঝে শুরু হলো কর্মের পাশাপাশি নতুন সংসার জীবন। কেউ কোনোদিন সন্ধ্যার আগেই বাসায় ফিরে আসত, আবার কেউ কোনোদিন রাত এগারোটার পর ফিরত। দীর্ঘদিন এভাবেই তাঁদের বিভিন্ন দ্বন্দ্ব-ঝামেলার মধ্য দিয়ে কাটছিল সংসার!
একদিন আশিক তাঁর স্ত্রীর অফিসের সামনের পথটি ধরে বাসায় হেঁটে আসছিল, ঠিক ওই সময়ে আশিক দেখতে পেল তাঁর সেই স্ত্রী অন্য আরেকজন পুরুষের সাথে প্রাইভেট কারে চড়ে কোথাও যেন যাচ্ছিল।
ওখান থেকেই শুরু হলো আশিকের জোড়া মনের অসহ্য অস্থিরতার এক মহা তাণ্ডব। তখনকার ওইসব দৃশ্য দেখার পর থেকে বাসায় ফিরেও আশিকের সময়গুলো একদম কাটছিল না। সেদিনও ওর স্ত্রী মীম যখন বাসায় ফিরেছিল, ঘড়িতে তখন বেজেছিল রাত এগারোটার মতো। আশিক অবশ্য মীমের ওইসব ঘৃণিত দৃশ্যগুলো দেখার পরও সেসব বিষয়ে মীমকে কোনো কিছুই প্রশ্ন করেনি। প্রতিদিনের মতো সেদিনও সে তাকে ঐ একই প্রশ্নটি করেছিল-
“এই চাকরিটা করতে গিয়ে তোমার যদি বেশি কষ্ট হয়ে থাকে, তবে তুমি আর সেটা কোরো না!”
আশিকের কথাটির জবাবে মীম বলেছিল-
“না, তা কেন হবে! আমি একদম ভালো আছি।”
মীমের হাতের ফোনটির রিংটোনটা প্রায় সময়টাই সে বন্ধ করে রাখত। সেদিন রাতেও সে তাই করে রেখেছিল। সেদিন মীম ফ্রেশ হওয়ার জন্য টেবিলের ওপর তাঁর হাতের ফোনটি রেখে বাথরুমে চলে গিয়েছিল আর আমি তখন বিছানাতেই শুয়েই ছিলাম। হঠাৎ আমার চোখের দৃষ্টি গেল মীমের ফোনটির ওপর। আমি তখন দেখছিলাম মীমের ফোনটির স্ক্রিনের আলোটি বারবার জ্বলছে ও নিভছে। বিছানা থেকে উঠেই আমি ধীরে ধীরে ফোনটির কাছে গেলাম। মীমের ফোনটি হাতে নিয়ে ফোনের স্ক্রিনে দেখতে পেলাম অজানা একটি নামে সেভ করা নম্বর। নম্বরটির নামটিতে লেখা ছিল সৌরভ। এ নামেই মীমের ফোনটিতে গত কিছুদিনে কয়েকশ বার তাকে ফোন করা হয়েছিল। তাহাই দেখতে পেয়েছিলাম মীমের ফোনটির কল লিস্টে গিয়ে। যেটাই হোক না কেন, তখনই আমি ফোনের কলটি খুব দ্রুত রিসিভ করে ফেললাম। কিন্তু কোনো রকমভাবে কথা না বলেই ওপাশের কথাগুলো শুধু চুপচাপ শুনছিলাম। ওপাশের ছেলেটির কথাগুলোর মাঝে যা শুনেছিলাম, তাঁর ভাষাগুলো ছিল এরকমটাই-
“আজ হয়তো একটু বেশিই তৃপ্তি ভোগ করেছিলে, তাই না!”
এছাড়াও আরও অনেক কিছুই সে তখন ফোনের ওপাশ থেকে বলছিল। ওইসব বাজে কথাবার্তাগুলো শুনতেও আমার অনেকটা ঘৃণাবোধ হয়েছিল। চট করে ফোনটির লাইনটা কেটে দিয়েই ফোনটি অনুরূপ ঠিক আগের জায়গায় রেখে দিয়েছিলাম। ফোনটি কেটে দেওয়ার পরও বিছানায় শুয়ে দেখছিলাম ছেলেটি আবারও বারবার ফোনের ওপর ফোন দিচ্ছে। পরে মীম বাথরুম থেকে বাইরে এসে ফোনটি তাঁর হাতের মুঠোয় নিয়ে ঘরের বারান্দার সামনের দিকে গিয়ে চুপিচুপি কীসব যেন কথা সমাপ্ত করে ফোনের লাইনটা কেটে ফোনটি রেখে দিয়েছিল টেবিলটির ওপরই।
পরপরই আমি খাবারের জন্য টেবিলে চলে গেলাম। খাবার প্লেটে দুই চামচ ভাত বেড়ে নিয়েই মীমকে বললাম-
“মীম, তুমি হয়তো আজ খাবে না, তাই না?”
মীম অবাক দৃষ্টিতে আমার দিকে তাকিয়ে বলল-
“কেন?”
“না, এমনিতেই জিজ্ঞেস করলাম আর কী।”
“ও, তাই বল।”
সত্যিই সেদিনের সেই রাতে মীম আর কোনো কিছুই তখন খায়নি। আমি কোনো রকম খাবারটা সেরেই বিছানায় এসে শুয়ে পড়লাম। বিছানায় শুয়ে কিছুক্ষণ পর মীমকে আমি তখন কয়েকটি কথা বললাম-
“মীম, তোমাকে আমি কিছু কথা বলছি শোনো! আমার কথাগুলো তুমি মনোযোগ সহকারে শুনবে! শোনো, আমি শুধু আজকের এই রাতটির জন্যই তোমার এই ঘরে রয়েছি! তবে তোমার স্বামীর পরিচয়ে নয়, বরং একজন মেহমান হিসেবে। ভোর হলেই আমি তোমার এ ঘরটি ছেড়ে চলে যাব আমার অতীত জীবনের পরিবারের কাছে। তুমি ভালো থেকো তোমার সৌরভ নামের সেই নতুন স্মার্ট ছেলেটিকে নিয়ে।”
আশিকের কথাগুলো শোনার পর মীমের মুখ থেকে আর একটি কথাও বের হচ্ছিল না যে, হঠাৎ করে কেন আজ আশিক তাকে এইসব কথাগুলো বলছে।
আশিক আরও কিছু কথা মীমকে বলেছিল, যা নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
“আচ্ছা মীম, বলো তো সত্যিই কি নারীরা বুঝি এমনটাই হয়? নাকি তাদেরও একেকটি সুন্দর বিবেক-মনুষ্যত্ববোধ বলে কিছু আছে? তাই যদি থেকে থাকে, তবে কেন তাঁরা এমনিভাবে মিছে সুখের আশায় অধিক পুরুষের জীবনে পা রাখে? কেন তাঁর স্বামীর গভীর ভালোবাসাগুলো পাওয়ার পরও হৃদয়টা ভরে না? তবে কি এটাই বুঝে নেব, সেই পুরুষটা তাঁর সত্যিকারের ভালোবাসাগুলো দিতে পারেনি? কেনইবা তাঁরা যথাসাধ্যের সুখ ও দুঃখগুলো ভাগাভাগি করে নিয়ে গড়তে পারে না ছোট্ট একটি সুখের সংসার? আচ্ছা বলো তো, কেনইবা তাঁরা অন্য আরেকটি পুরুষকে পেয়েই গত জীবনের সবকিছু ফেলে রেখে চলে যায়? তবে কি সত্যিই পুরুষেরা ধন্য মনে করবে তোমাদের মতো নারীদের বিয়ে করে? অবশ্য খুব ভালোই পারো তোমরা দশ দশটি ছেলের জীবন নিয়ে খেলতে- তাই না?”
সেদিন আশিক বুকের মাঝে অজস্র বেদনা লুকিয়ে রেখে অনেক কিছুই সে মীমকে বলে ঘর থেকে বের হয়ে চলে গিয়েছিল। ঘরের সমস্ত কিছু মীমের হাতে বুঝিয়ে দিয়ে সে আগের মতোই তাঁর অতীত জীবনের ঠিকানায় চলে গিয়েছিল। নতুন করে এখন তাঁর একটাই চিন্তাভাবনা, তা হলো পরিবারের কাছে ফিরে গিয়ে তাঁর ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া ও পরবর্তী সময়ে তাকে তাঁর বাবা-মায়ের পাশে থেকে ভালো একটি কর্মের অর্জিত অর্থে পরিবারকে সাহায্য-সহযোগিতা করা ছাড়া অন্য আর কিছুই কল্পনার সাধনা নেই।
এরই ধারাবাহিকতায় সমগ্র নারী ও পুরুষের নিকট আমিও কিছু প্রশ্ন তুলে ধরছি-
দয়া করে কোনো নারী/পুরুষ জাতি আমার এই প্রশ্নে আপনারা কেউ রাগান্বিত হবেন না। এছাড়া সবাইকে এটিও বিশেষভাবে অনুরোধ করছি, আশা করি আমার প্রশ্নটির জন্য সবাই আমাকে ক্ষমার দৃষ্টিতে দেখবেন!
প্রশ্নগুলো হচ্ছে এমনটাই-
০১. সংসারের সামান্য একটু সুখই কি আপনার জীবনে শান্তি ফিরিয়ে দিতে পারে না?
০২. জীবনে একটিবার বিয়ে করেই কি জীবনের বড় সম্মানটি পাওয়া সম্ভব নয়?
০৩. জীবনে একটিমাত্র সংসারে থেকেই আপনারা কি সেটাকেই স্বর্গমহল হিসেবে সাজাতে পারেন না?
০৪. অল্প কিছু অর্থের দ্বারাই কি আপনার সামান্য সম্পদকে বিশাল আকারে গড়ে তুলতে পারেন না? সেটিও কি অন্যরকম করে অন্তত একটু ভাবা যায় না?
০৫. জীবনে একটি কথাই স্মরণ রাখবেন, নিজের প্রতিভা, নিজের সঠিক লক্ষ্য, নিজের একটু ধৈর্য-খেয়ালের কারণেই সকল অসম্ভবকে দ্রুত সম্ভবে পরিণত করা যেতে পারে, এটা জানার পরও তবুও কেন সেই ধৈর্যটি ধরে রাখতে পারেন না?
০৬. অতএব আসুন আজকের পর থেকে সকলেই এটাই প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হই যে, আমাদের মনোভাবের চরিত্রটিকে সৎ, সুন্দর ও সুখের জীবনে গড়ে তুলব! এরপর থেকে যেন দেখতে না হয়- পথের ধারের নোংরা নর্দমায় পড়ে আছে নারী কিংবা পুরুষ কেউ?
সবশেষে সকলের নিকট এটুকুই প্রত্যাশা করছি- সকলের স্বভাব-চরিত্র ও চলাফেরাগুলো সুন্দর হোক, এই কামনায় ইতি টানছি। সবাই ভালো থাকবেন, সুস্থ থাকবেন। সবাইকে অসংখ্য ধন্যবাদ।
বি. দ্র: ভুলত্রুটি মার্জনীয়, লেখাটি আধুনিক যুগের কিছু নারী ও পুরুষ উভয় পক্ষের স্বভাব-চরিত্রগুলো লক্ষ্য রেখেই লেখা।
রচনাকাল: ১৪-১০-২০১৭ ইং।
মন্তব্য করুন