বর্তমান সরকারের শাসননামলে এই প্রথমবার একাধারে বাংলাদেশের সড়কে যুক্ত করা হয়েছে নতুন গোলাপী রঙের বাস। বাসটির চালক থেকে শুরু করে সহকারী পর্যন্ত প্রত্যেকেই নারী। বিষয়টি সত্যিই একটু ব্যতিক্রমী।
তাই রাস্তায় এই গোলাপী রঙের বাসটি চলাচল করতে দেখলেই অনেকে আগ্রহের দৃষ্টিতে প্রশংসা করছেন ও উৎসাহ দিচ্ছেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সোশ্যাল মিডিয়ায় কিছু সংখ্যক দুষ্কৃতকারী মনমানসিকতার মানুষকে দেখা যাচ্ছে যারা এই উদ্যোগটি নিয়ে নোংরা মন্তব্য ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে, বিদ্রূপ করছে। কেউ নারী চালক ভেবে হাসি-তামাশা করছে, কেউবা আবার এমন কথাটিও ছড়িয়ে বেড়াচ্ছে- যেন নারীদের বাসের স্টিয়ারিং ধরাটাই বড় অপরাধ!
তাদের উদ্দেশ্যে আমি এটুকুই বলতে চাই- আচ্ছা বলুন তো, বাস হোক বা অন্য কোনো যানবাহনই হোক, সেখানকার চালকের আসনে একজন নারী বসলে সমস্যাটা কোথায়? একজন পুরুষ বাস চালালে যদি সেটি তখন স্বাভাবিক মনে হয়, তবে একজন নারী বাস চালালেই কেন এত প্রশ্নের ঝড় তোলা হয়?
দেখুন, আমাদের দেশে প্রতিদিন লক্ষ লক্ষ নারীরা স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, অফিস, আদালত, হাসপাতাল, গার্মেন্টসসহ বিভিন্ন কর্মস্থলে যাতায়াত করেন। তাঁদের অনেকেরই একমাত্র ভরসা গণপরিবহন। আর এই গণপরিবহনে নারীদের কী ধরনের যে অভিজ্ঞতার মধ্য দিয়ে পারাপার করতে হয়, সে সম্পর্কে আমরা কমবেশি সবাই জানি।
অতিরিক্ত ভিড়ের মধ্যে অস্বস্তি, কটূক্তি, ইচ্ছাকৃত ধাক্কাধাক্কি, অশালীন আচরণ, যৌন হয়রানি- এসব কোনো নতুন বিষয় নয়। অনেক নারীই প্রতিদিন এমন পরিস্থিতি সহ্য করে কর্মস্থলে যাচ্ছেন। শুধু নারী হওয়ার কারণেই তাঁদের বারবার এমন পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হচ্ছে, যা একজন পুরুষ যাত্রীর ক্ষেত্রে সচরাচর হয়ই না।
এমন পরিস্থিতির মধ্যে যদি নারীদের জন্য এমন একটি পরিবহনের ব্যবস্থা করা হয়ে থাকে, যেখানে চালক ও সহকারী উভয়ই নারী- তবে সেটিকে কেন্দ্র করে এত কটূক্তি ও হাসি-তামাশা করার কারণটিও আমি ঠিক বুঝি না।
বরং আমার মতে, সেখানে একজন নারী যাত্রী কিছুটা স্বস্তি বোধ করতে পারেন। অন্তত তাঁর মনে এই বিশ্বাসটুকু থাকতে পারে যে, বাসের কর্মীদের কাছে তাঁর সমস্যার কথাগুলো আরও সহজে বলতে পারবেন। এখানে নিরাপত্তার অনুভূতিটা খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একজন মানুষ কোথাও যাওয়ার সময় শুধু গন্তব্যে পৌঁছাতেই চান না, বরং নিরাপদেও পৌঁছাতে চান।
তাই আমি মনে করি, এই গোলাপী রঙের বাসটি কোনো বিশেষ দয়ায় তৈরি নয়, কিংবা নারীদের বিলাসী কোনো সুবিধাও নয়। নিরাপদে চলাচল করার সুযোগ ও সুবিধা নারী যাত্রীদের মৌলিক অধিকার।
আমাদের সমাজে এখনো সেই পুরোনো ধারণাটিই কাজ করে- ড্রাইভিং শুধু পুরুষদের কাজ। বিশেষ করে বাস, ট্রাক বা ভারী যানবাহন নাকি শুধু পুরুষরাই চালাতে পারবে! কিন্তু কেন? এই ধারণাটির কি কোনো যুক্তি রয়েছে?
একটি গাড়ি চালাতে হলে প্রশিক্ষণ লাগে, লাইসেন্স লাগে, রাস্তার নিয়ম জানতে হয়, ধৈর্য লাগে এবং দায়িত্বশীল হতে হয়। এগুলোর কোনোটিই শুধু পুরুষদের জন্য নির্ধারিত নয়। নারীরা যদি প্রশিক্ষণ নিয়ে দক্ষতার সাথে বাস চালাতে পারেন, তবে শুধু নারী ভেবে তাঁদেরকে পিছিয়ে রাখার কারণটা কী?
আমার কাছে বরং বিষয়টি একটু অন্যরকম। একজন নারী যখন বাসের স্টিয়ারিং ধরেন, তখন তিনি শুধু একটি বাসই চালান না; তিনি সমাজের সেই পুরোনো ধারণাটির বিরুদ্ধেও রুখে দাঁড়ান- ‘এই কাজটি নারীরা কখনোই করতে পারবে না।’
কিন্তু একজন নারী যখন নিজের দক্ষতায় সেই কাজটিই করে দেখান, তখন ওই কুসংস্কারপূর্ণ ধারণাটিই প্রশ্নের কাঠগড়ায় দাঁড়ায়। আসলে চালকের যোগ্যতা কখনো লিঙ্গ দিয়ে বিবেচনা করা সম্ভব নয়। একজন ভালো চালক সবসময়ই একজন ভালো চালক- তিনি পুরুষ কিংবা নারী আর যাই হোন না কেন।
এর পাশাপাশি একজন নারীর কর্মজীবনের বিষয়টিও আমাদের অন্যভাবে দেখা উচিত। একটি চাকরি বা পেশা একজন নারীর জীবনে শুধু মাস শেষে বেতন পাওয়ার বিষয় নয়। নিজের আয় থাকলে একজন নারী তাঁর জীবনের প্রয়োজনীয় সিদ্ধান্ত নিজেই নিতে পারেন, পরিবারের পাশে দাঁড়াতে পারেন, সন্তানদের পড়াশোনায় সাহায্য করতে পারেন এবং নিজের প্রয়োজন মেটাতে পারেন। সবচেয়ে বড় বিষয় হলো, তাঁর ভিতরে একধরণের আত্মবিশ্বাস সৃষ্টি হয়।
নারীরা শুধু নিজেদের জন্যই কাজ করেন না; পরিবারের ক্রান্তিলগ্নে তাঁরাই মূল ভরসা হয়ে দাঁড়ান। তাই বর্তমান প্রেক্ষাপটে নারীরা যখন বাস চালিয়ে উপার্জন করছেন, তখন এটা নিয়ে হাসাহাসি বা রং-তামাশা করারও কিছু নেই। বরং এটি তাঁদের সম্মান জানানোর মতো একটি বিষয়।
অন্যদিকে, অন্যান্য নারীদের ওপরও এর ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। একজন নারী যখন নতুন কোনো কাজ শুরু করেন, তখন তা দেখে অন্য নারীরাও মনে বল ও সাহস খুঁজে পান। হয়তো কোনো নারী তা দেখে মনে মনে ভেবে নেন- ‘আমি কেন পারব না?’ এই যে ‘আমিও পারব’ ভাবনার স্ফুরণ, এটিই সবচেয়ে বড় বিষয়।
কিন্তু দুঃখজনক হলেও এটাই সত্যি যে, আজকাল নারীরা একটুখানি সামনের দিকে এগোতে চাইলেই আমাদের সমাজের কিছু মানুষ অস্বস্তি বোধ করেন। তাঁরা মূলত যুক্তির পথ খুঁজে না পেয়ে নারীদের নিয়ে কটূক্তি করা শুরু করেন। নারীরা কী ধরনের পোশাক পরেছেন, কেমন কাজ করছেন, কোথায় যাচ্ছেন ইত্যাদি এইসব নিয়ে তাঁদের যেন মাথাব্যথারও শেষ নেই!
সম্প্রতি গোলাপী বাসটিকে কেন্দ্র করে ঠিক একই রকম বিষয়টিও লক্ষ্য করা যাচ্ছে। হ্যাঁ, গঠনমূলক সমালোচনা থাকতেই পারে। কোনো উদ্যোগে ভুল কিছু থাকলে তা নিয়ে আলোচনা করা নিশ্চয়ই জরুরি। বাসের ব্যবস্থাপনা ভালো না হলে, চালকের প্রশিক্ষণ যথেষ্ট না থাকলে বা যাত্রীসেবা বিভ্রান্তিকর মনে হলে সেসব নিয়ে আলোচনা করা যেতেই পারে। কিন্তু ‘নারীরা বাস চালাচ্ছেন’ বলে শুধু এই কারণেই রং-তামাশা ও বিদ্রূপ করাটি মোটেও যুক্তির মধ্যে পড়ে না।
তাছাড়া সমালোচনা আর কটূক্তি কখনো এক জিনিস নয়। আর যারা নারীদের ঘরের বাইরে কাজ করা বা পেশায় যুক্ত হওয়াকে ধর্মের সাথে সাংঘর্ষিক মনে করেন, তাঁদেরও একটু ইতিহাস পড়ে দেখা জরুরি।
ইসলাম নারীদের সম্পদের অধিকার দিয়েছে, ব্যবসা-বাণিজ্য করার অধিকার দিয়েছে এবং সম্মানের সাথে সমাজে চলার অধিকার দিয়েছে। হযরত খাদিজা (রা.) নিজেও একজন সফল ব্যবসায়ী ছিলেন। তিনি ব্যবসা পরিচালনা করেছেন, সম্পত্তি অর্জন করেছেন এবং সমাজে সম্মানের সাথে অবস্থানও করেছেন।
তাই নারীরা কাজ করবে, নিজেদের যোগ্যতা অনুযায়ী দাঁড়াবে- এটাকে সরাসরি ধর্মবিরোধী বলে আখ্যায়িত করারও কোনো সুযোগ নেই। তবে নারীদের অধিকার নিয়ে কথা বলার আগে একটি বিষয় পরিষ্কার করা প্রয়োজন- নারীদের অধিকার মানে পুরুষদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করা নয়; আর নারীরা এগিয়ে যাচ্ছে বলেই যে পুরুষেরা পিছিয়ে পড়ছে, বিষয়টি তাও নয়।
একজন নারী নিজের পায়ে দাঁড়ালে একজন পুরুষের সম্মান কখনো কমে যায় না। একজন নারী ভালো চাকরি করলে পুরুষ কখনো ছোট হয়ে যায় না। একজন নারী বাস চালালে পুরুষের কাছ থেকে স্টিয়ারিং কেড়ে নেওয়া হয় না। বরং নারী-পুরুষ উভয়েরই কাজ করার সমান সুযোগ থাকা উচিত।
আমরা যদি সত্যিই এ দেশকে এগিয়ে নিয়ে যেতে চাই, তবে দেশের অর্ধেক জনগোষ্ঠীকে শুধু ‘নারী’ হওয়ার কারণে পিছিয়ে রাখার কোনো যুক্তি নেই। একজন নারী কী করতে পারবেন আর কী পারবেন না- তা তাঁর যোগ্যতা দ্বারাই বিবেচনা করা উচিত।
গোলাপী রঙের বাসটি হয়তো দেশের সকল নারী যাত্রীর নিরাপত্তার সব সমস্যার সমাধান করে দিতে পারবে না। আর একটিমাত্র উদ্যোগ দিয়ে এত বড় সমস্যার সমূল উৎপাটন করাটিও সম্ভবও নয়। কিন্তু তাই বলে এই উদ্যোগটিকে ছোট করে দেখারও কোনো কারণ কিন্তু নেই।
একদিনেই কোনো বড় পরিবর্তন বা সফলতা আসে না। বরং ছোট একটি উদ্যোগ থেকেই ধীরে ধীরে বড় কোনো পরিবর্তনের সূচনা হয়।
আজ যখন কিছু নারী বাস চালাচ্ছেন, তা দেখে হয়তো কেউ হাসছেন। কিন্তু সেই হাসির থেকেও আমার কাছে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো- কিছু নারী পেশা হিসেবে এই কাজটিকে বেছে নিয়েছেন এবং বাসের স্টিয়ারিংয়ে বসেছেন। তাঁদের এই প্রচেষ্টাকে প্রশংসা করা উচিত। কোথাও ভুল থাকলে সেটিও নিয়ম অনুযায়ী ধরিয়ে দেওয়া উচিত, কিন্তু নারী পরিচয়ের কারণে তাঁদের অপমান করাটি মোটেও গ্রহণযোগ্য নয়।
কারণ একজন নারী যখন রাস্তায় বাস চালান, তখন তিনি কারও সাথে প্রতিযোগিতায় নামেননি। তিনি নিজের জীবনের প্রয়োজনে, পরিবারের জন্য কাজ করছেন। তাঁরও সংসার আছে, স্বপ্ন আছে, অভাব-অনটন আছে এবং সম্মানের সাথে বাঁচার অধিকার আছে।
তাই আসুন, রাস্তায় গোলাপী বাস দেখলে কটূক্তি না করে একটু অন্যভাবে ভাবি:
• হয়তো স্টিয়ারিংয়ের ওপারে বসে থাকা নারীটি অনেক বাধা পেরিয়ে আজ সেখানে পৌঁছেছেন।
• হয়তো তাঁর পুরো পরিবারটি তাঁর উপার্জনের ওপরই নির্ভর করছে।
• হয়তো তাঁকে দেখে অন্য কোনো নারী নিজের স্বপ্ন নিয়ে নতুন করে ভাবার সাহস পাচ্ছেন।
আর এ কারণেই আমি মনে করি, গোলাপী রঙের বাসটি নিয়ে হাসাহাসি না করে আমাদের বরং উৎসাহ দেওয়া উচিত। কারণ আজ যে নারীটি বাসের স্টিয়ারিং ধরেছেন, আগামী দিনে হয়তোবা তিনি আরও বড় কোনো দায়িত্ব সামলাবেন।
তাই আসুন, রাস্তায় কোনো গোলাপী বাস দেখলেই কটূক্তি নয়, বরং সম্মান জানাই। কারণ পরিবর্তন যখন দরজার সামনে এসে দাঁড়ায়, তখন তাকে সাদরে গ্রহণ করাটাই শ্রেয়।
রচনাকাল: ২১-০৮-২০২৬ইং।
মন্তব্য করুন