৯ই এপ্রিল, দুই হাজার পেরিয়ে এক বছরের সেই আধা আলোয় ভরা সোমবার রাত ১০টা থেকে ১১টার ভেতরেই বিপদগামী আমাদের ভালোবাসার গাঢ় বন্ধনে বাঁধা দুটি মনকে আমরা বিশাল একটি মণি-মুক্তার পাত্রে যত্নে তুলে রেখেছিলাম। বিপদগামী আমাদের ওই সময়কার কটি বছর যে আমরা অতিবাহিত করেছিলাম- সেই দিন, রাত, মাস এবং বছরগুলোর হিসেব আজও আমি মেলাতে পারছি না!
আমার হিসেবের কথাটা না হয় পড়েই থাক, আপাতত তোমার হিসেবটাই একটু মিলিয়ে দেখি!
কি পেলে আর কি রেখে এলে- তার ধারাবাহিকতা যদি নিজের কাছে তুলে ধরি, তবে আমার হৃদপিণ্ডে বিকট কম্পন সৃষ্টি হয়ে পাঁজরের সমস্ত হাড়গুলো নড়বড় করে দেয়। সেদিনের ওই অসমাপ্ত রাতে সুখ-শান্তিকে ঘিরে তোমার আর আমার মধ্যকার কিছু চাওয়া-পাওয়া নিয়ে বিভিন্ন কথাবার্তা বলছিলাম।
ওই রাতে একেকটি প্রশ্নের বিপরীতে সঠিক উত্তর দেবার কথাগুলো আজও আমার ভীষণ মনে পড়ে। ওইসব অগোছালো প্রশ্নের জবাব দিতে না পারার হতাশায় আজও এই পাষাণ হৃদয়টা আমার ঘৃণায়, সময়হীনতায় অঝোর ধারায় কাঁদে। মনে পড়ে, কতটা অন্যায়-অবিচার করেছিলাম তোমার সঙ্গে, সেজন্য নিজেকে আমি অপরাধে ভরা একটি বাক্স মনে করছি।
জানি, যেসব অপরাধের ক্ষমা পাবার যোগ্য ব্যক্তিও নই আমি, তবুও- ওইসব বাজে ব্যবহারের জন্য তোমার কাছে মিনতি করে অনুরোধ করছি, তুমি আমায় ক্ষমা করে দিও।
সূক্ষ্মভাবে ভেবে দেখেছিলাম, নিজের পরিবারের কাছে যদি তোমাকে নিয়ে যেতে পারি, তবে হয়তো তারা তোমায় যথেষ্ট আদর, স্নেহ, ভালোবাসা দিয়ে ভরিয়ে রাখবে! পরে আমি সেটাই ভেবে তোমাকে সাথে নিয়ে রওনা দিয়েছিলাম আমার পরিবারের কাছে।
আমার পরিবারে আমি যেন কখনো ফিরে না যাই, এ ব্যাপারে তুমিও আমায় বহুবার নিষেধ করেছিলে। তবে আমি তোমার ওই নিষেধের কথাটি মূল্যহীন ভেবে এড়িয়ে গিয়েছিলাম। এ জন্যই হয়তো আজও আমি প্রতিটা সময় ভুলের ভূমিতে যুদ্ধ করে চলেছি! জানি না এই যুদ্ধ কবে থামবে! ক্যালকুলেটর মেশিনের সংখ্যার বাটনগুলো একেকটি করে এখনো মাঝে চাপতে থাকি।
কিন্তু সবগুলো সংখ্যাকে যখন একসাথে জড়ো করে যোগ, বিয়োগ, গুণ ও ভাগফলে অনুধাবন করতে থাকি, তখনও ফলাফলের শেষে শূন্য ছাড়া অন্য কোনো ফলটা মেলাতে পারি না। এ জীবনে আরও কতবার যে নতুন নতুন অত্যাধুনিক ক্যালকুলেটর আমাকে ব্যবহার করতে হবে, সেটাও বলতে পারছি না! এভাবেই হয়তো কোনো এক সময় আমার হাতের সবগুলো আঙুল অকেজো হয়ে যেতে পারে!
এরপরও হয়তো দেখব ওই একই উত্তর- অবশেষে শূন্যই। তোমার আর আমার সংসার জীবনের সম্পর্কের এই মুহূর্তের ক্যালকুলেটরের হিসেব অনুযায়ী এখন আমাদের বয়স অতিবাহিত হতে চলছে ১৭ বছর, কিংবা আরও নিখুঁতভাবে বললে- ৫৫৩,১৩২,৮০০ থেকে ১-০ সেকেন্ড গড়িয়ে ঘড়ির কাঁটা তিনটি এখনও টিকটিক শব্দে ঘুরছে।
আরও সহজভাবে বললে- আজকের এই সংসার জীবনের কর্মফলের হিসেব অনুযায়ী, ২০০১ সালের এপ্রিল মাসের কোনো এক সোমবার আমাদের এই অবহেলিত সংসার জীবন শুরু হয়েছিল। সেই সাথে আমাদের চলমান হিসেবটা এটাও জানিয়ে দেয় যে, সংসার শুরুর সেই দিনটি আমরা আবার ফিরে পাব আর মাত্র ৫ মাস ২১ দিন পরে!
সবচেয়ে বড় দুঃখজনক বিষয় হলো, এই দিনটির কথা আমরা বা অন্য কেউ কখনো তেমনভাবে স্মরণও করেনি। অথবা এই দিনটির জন্য আনুষ্ঠানিক কোনো উৎসবের আয়োজনও কেউ করিনি! কী করে করবে! সংসারে কি আর কাজ কম ছিল! কাজের ব্যস্ততায় কখন কোন মুহূর্তে যে দিন ও রাত পেরিয়ে মাস ও বছরে ফিরে এসেছিল, সেটা ভাবার সময় কী আর ছিল? ছিল না।
কত মায়া-মমতায় ভরা একটি পরিবার। সেই পরিবারে তুমি আমি সহ আরও অনেকেই ছিল। একেক জনের চাহিদারও কোনো অপূর্ণতা ছিল না। বেশ ভালোভাবেই সবাই একসাথে বসবাস করেছিলাম বলে কেটেছিল। বাড়ির চারপাশ বিভিন্ন গাছপালায় ছেয়ে ছিল। সামান্য একটু বাতাস বইলেই গাছের মরে যাওয়া পাতাগুলো ঝরঝর করে পড়ে বাড়ির দেড় বিঘা জমির সম্পূর্ণ আঙিনার চারপাশটা বিশ্রী আবর্জনায় ভরে যেত।
তুমি তোমার পরনের অধৌত ওড়নাটা টেনে পেঁচিয়ে নিতে তোমার পাতলা, চিকন কোমরে। এরপর বড় সাইজের একটি বাঁশের শলার ঝাড়ু হাতে নিয়ে প্রায় এক থেকে দুই ঘণ্টা ধরে পুরো আঙিনায় পড়ে থাকা সমস্ত আবর্জনাগুলো কত যত্ন সহকারে পরিষ্কার করতে। ওই সময় তোমার কতটা যে কষ্ট হতো, সেটা শুধু আমিই বুঝতাম, যখন তুমি পরিষ্কারের মাঝপথে এসে কোমরে ব্যথা অনুভব করতে। আমি দেখেছিলাম, তুমি তোমার চিকন কোমরটা ঠিকমতো সোজাও করতে পারছিলে না।
তখনই আমি রেগে গিয়ে তোমার হাত থেকে ঝাড়ুটা কেড়ে নিয়ে আঙিনার বাকি অংশের ময়লা আবর্জনাগুলো পরিষ্কার করেছিলাম! রাত ঘনিয়ে এলে দুজনার ক্লান্ত শরীরে বিছানায় শুয়ে পড়তাম। শোবার কিছুক্ষণ পরই তুমি আমার কোমরের ওপরে আর আমি তোমার কোমরের ওপরে দুটি পা দিয়ে কোমরের বিষ-বেদনাগুলো দূর করে নিতাম! তারপর ফের শুরু হতো দৈনিক সকাল বেলায় শত শত মণ ধান সিদ্ধ করার নানান ব্যস্ততা।
এছাড়া পরিবারের আর সকলের খেয়ালটিও মাথায় রাখতে হতো- কে কী খেল, ইত্যাদি আরও বিভিন্ন কাজের ব্যস্ততায় দিনরাতগুলো আমরা দুজনে অতিবাহিত করেছিলাম! বিনিময়ে কখনো এটাও বলিনি যে, এই সংসারে তো আরও অনেকেই ছিল, তাঁরা কেন বসে বসে শুধু খাবে! কখনো এটুকুও চিন্তা করিনি যে, মূলত এই সংসারটা কার ছিল! শুধু মনে মনে এটাই প্রতিজ্ঞা করেছিলাম যে- সংসারের এই সামান্য পরিশ্রমের বিনিময়ে পরিবারের সবার কাছ থেকে যেন অল্প কিছু ভালোবাসা আদায় করতে পারি!
অথচ দেখ, আজ তাদের কাছ থেকে আমরা এমন ভালোবাসা পেয়ে গেলাম যেন তাঁরা সবাই আমাদের দুজনকে বিশ্বাসঘাতক এবং সুবিধাভোগীর পদবীটাই দিয়ে দিল!
৮-৯ হাত একটি ছোট্ট ঘর তাঁরা করুণা করেই হয়তো আমাদের দিয়েছিল! একই পরিবারে একই সাথে থাকি বলে এতটুকু ঘর তো তাঁরা দিতেই পারে! তাই না? তাছাড়া যেকোনো পরিবারে যখন কেউ মাসের পর মাস ঘরের কাজগুলো সেরে থাকে- অন্তত সেই কাজের লোকটির জন্য তো থাকার একটি ঘরেরও প্রয়োজন! আমরা এটাও কখনো জানতাম না যে, এতদিন তাঁরা শুধু আমাদের দুজনকে পরিবারের সদস্য নয়, সেই কাজের লোকই ভেবে আসছিল! তাঁরা যে কতটা স্বার্থপর ছিল, শেষ পর্যন্ত সেই ছোট্ট ঘরটিতেও আমাদের আর স্থান হলো না!
১৯৯৫ সাল, সে তো শুধু অল্প কিছুদিনের কথা! শুধু এইটুকুই বলব, যিনি এই ১৯৯৫ সালকে উল্লেখ করে অহেতুক উদাহরণ দিচ্ছিলেন, তাকেই বলছি-
এই যে সাহেব শুনুন? আমি ভুলিনি সেই ১৯৯১ সালটিকেও! মনে কি পড়ে সেই গর্ভধারিণী মায়ের এগারো হাত একটি প্রিন্ট শাড়ির কথা? যেটি দ্বারা তোমাদের জন্য চার চারটি নতুন শার্ট তৈরি করা হয়েছিল? একটা বিশেষ দিনে গর্ভধারিণী মা তোমাদের চারজনকে তা উপহার হিসেবে দিয়েছিলেন? সেই বিশেষ দিনে কি অন্য আরেকটি শার্ট তৈরি করার কাপড়টুকু কম পড়েছিল? নাকি সেদিনও আমি তোমাদের মাঝে আপন বলে কেউ ছিলাম না বলেই তা তৈরি করা হয়নি?
আমি এটিও ভুলিনি ১৯৮৮ সালের সেই ভয়াবহ বন্যার কথা! সেদিন বাড়ির সমস্ত আঙিনা হাঁটুর ওপরে পানিতে ডুবে ছিল। সেদিন আমি খুব ছোট ছিলাম, তবে সবকিছু বুঝতে আমি ঠিকই পারতাম। অতটুকু বয়সে আমি অথৈ পানিতে সাঁতরে সাঁতরে কয়েকটা কলা গাছ একখানে করে বিশাল বড় একটি ভেলাও তৈরি করেছিলাম। যার দ্বারা বাড়ির সকলে মিলে খুব সহজেই এপার থেকে ওপারে পারাপার করতে পেরেছিল!
এসব শুধু নমুনা! এছাড়াও অন্যান্য আরও কিছু জটিল বিষয় রয়েছে যা এখানে না বলে অন্তরেই গোপন করে রেখে দিলাম! ওগুলো ভেবে এভাবে উদাহরণ দিতে চাই না। শুধু এটুকুই বলতে পারি যে, কেউ যদি আমায় ওইসব অতীত বিষয়ের কোনো কিছুর বিবরণ তুলে ধরে কিংবা মনে করিয়ে দেয়, তবে আমি তা স্পষ্ট, অনর্গল, পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে বুঝিয়ে দিতে পারি!
আর যদি কেউ সেগুলো জানতে না চায়, তবে আমিও ভুল করে কাউকে অগ্রিম কিছু বলতে চাই না। আমি এই সংসারে কালো বিদঘুটে একটা অপদার্থ ছেলে ছিলাম। সবাই আমাকে বাঁকা চোখে দেখত এবং মাঝে মাঝে পাগল বলে তামাশা করত। তবুও আমি ওসব কিছুই মনে করতাম না। কিন্তু আর কতক্ষণ, কতকাল! এরকম বেশে এ হৃদয়ের ধৈর্যও আর ধরে রাখতে পারছে না!
একেকটা সময় ভেবে ভেবে আমি সত্যি সত্যিই পাগলের মতোই হয়ে গিয়েছিলাম। কখনো সখনো নানা প্রকার নেশায় আসক্ত হয়েছিলাম। আবার কখনো প্রতিহিংসায় অজান্তে আজেবাজে ঘৃণিত ধরনের কাজকর্মেও লিপ্ত ছিলাম! ওইসব নিয়ে এখন উপলব্ধি করলেও নিজেকে ভীষণ খারাপ লাগে। যখন এসব ব্যাপারে সামান্য একটু বোঝার চেষ্টা করতাম, ঠিক তখনই হঠাৎ তোমার ভালোবাসায় আমি আমার বাকি জীবনটা তোমার বন্দিশালায় নিজেকে বন্দি করেছিলাম।
বন্দি জীবনে ধীরে ধীরে আমার বাজে অভ্যাসগুলোও কমতে শুরু করেছিল। হঠাৎ কোনো একদিন তোমাকে ছেড়ে অন্য একটি দেশে পাড়ি দিলাম। সেখান থেকে ফোন করে জাবলাম, তাঁরা এখনো তোমার কাঁধে বিভিন্ন কাজের বোঝা তুলে দিয়ে রেখেছে। এখনও তাঁরা তোমার সাথে অমানবিক আচরণ করেই চলছে। আমি সেদিনও ওসব সহ্য করে নিয়েছিলাম এই জন্য যে, আমার পরিবারের সবাইকে আমি যথেষ্ট ভালোবাসি বলে।
তুমি শত কষ্টের মাঝে থাকলেও এরপরও আমি তোমায় তাদের কাছ থেকে আলাদা করিনি, এটা ভেবে যে, তুমি আলাদা হয়ে গেলে তাঁরা তখন কীভাবে দুই বেলা খাবার খাবে ও কী করে বাবা-মা বুড়ো বয়সে রান্না করে খাবেন! তাছাড়া এই বৃদ্ধ বয়সে তাঁরা সংসারের কাজগুলোই বা কীভাবে সারবেন। এইসব নানা কিছুর চিন্তা করে তোমাকে আমি তাদের কাছ থেকে আলাদা করতে পারিনি!
বরং তাদের পক্ষ হয়েই কারণে-অকারণে না শুনে, না বুঝে কতটা রাগে-অভিমানে অগণিত আজেবাজে ভাষায় তোমার ওপর অযথা জ্বালাময়ী দোষের ভারী বোঝাটাই চাপিয়ে দিয়েছিলাম। যা তুমি নীরবে বহন করেছিলে! অথচ আজ বুঝতে পারছি, ওসব বিষয়ে বিন্দুমাত্র তোমার কোনো দোষ-ত্রুটিও ছিল না। কিন্তু আজ যখন আমি এটাও পরিষ্কারভাবে জানতে পারলাম যে, তাঁরা তাদের স্বার্থের জন্য তোমাকে ও আমাকে কাজের লোক ভেবেই এতদিন ব্যবহার করে এসেছিল, তখন আর আমি তোমায় কী আর বলতে পারি বলো?
তবুও আমি তোমাকে আমি এটুকুই নতস্বরে বলছি শোনো, তুমি চলে যাও এই মিথ্যে মায়ার বিশৃঙ্খল সংসারটি ছেড়ে, আবারও বেঁধে নিও কাঁচা ঘর কোনো একটি অপরিচিত জায়গায় গিয়ে, সেখানে গিয়ে অবশ্যই ফের গড়ে তুলো তোমার সেই মায়াময়ী হাতের স্পর্শে ছোট্ট একটি সুখের, শান্তি জলে ভরা স্বপ্নের সংসার! অতএব, তোমার জীবনে আর যাই কিছু ঘটেছিল- মুচকি হাসি হেসে তা ভুলে যেও ওইসব নোংরা অতীত।
রচনাকাল: ১৯-১০-২০১৮ ইং।
মন্তব্য করুন