রাত প্রায় সাড়ে এগারোটা। গাইবান্ধা জেলা শহরের রেলস্টেশনটা তখন প্রায় জনশূন্য। আশপাশের লাইটপোস্টগুলো মিটমিট করে জ্বলছিল, মাঝেমধ্যে বাতাসের গতিবেগে শোনা যেত শুকনো পাতার মরমরে শব্দ। প্ল্যাটফর্মের মাঝখানের বেঞ্চটায় একা একটি মেয়ে বসেছিল। হাতে ছিল তাঁর ছোট্ট একটি কাপড়ের ব্যাগ। পরনে সাধারণ সালোয়ার-কামিজ। দু’চোখের দৃষ্টি ছিল তাঁর রেললাইনের দিকে। কাহারও অপেক্ষায় নয়, বরং তাঁর তাড়া ছিল অন্য কোনো উদ্দেশ্যের।
স্টেশনের বৃদ্ধ চা’য়ের দোকানদার রহিম চাচামিয়া দোকান গুটিয়ে চলে যাওয়ার আগ মুহূর্তে মেয়েটির কাছে এলেন, এসে তিনি বললেন,
“মা, শেষের ট্রেনটা তো আসতে আরও মিনিট বিশেকের মতো লাগতে পারে। তো কোথায় তুমি যাবে?”
মেয়েটি মৃদু হেসে বলল,
“জানি না চাচা।”
রহিম চাচা অবাক হয়ে বললেন,
“টিকিট কেটেছ কি?”
মেয়েটি ব্যাগের পকেট থেকে একটা টিকিট বের করে বৃদ্ধের হাতে ধরিয়ে দিয়ে বলল,
“দেখুন তো চাচা টিকেটটা ঠিক আছে কিনা.!”
টিকিটটির গন্তব্যের জায়গায় লেখা ছিল-
“শেষ স্টেশন।”
বৃদ্ধ চাচামিয়া টিকেটটা দেখার পর মেয়েটিকে আর কিছুই বললেন না। শুধু এককাপ গরম চা বানিয়ে তাঁর বেঞ্চের পাশে রেখে চলে গেলেন। এর কিছুক্ষণ পরেই প্ল্যাটফর্মে এলেন স্টেশনমাস্টার। তিনি এসে লক্ষ্য করলেন, মেয়েটি বারবার ব্যাগের ভেতর থেকে পুরোনো একটি ছবি বের করে দেখছিল। সেই ছবিটিতে হাস্যোজ্জ্বলে দাঁড়িয়ে ছিল তিনজন- ‘একটি ছোট্ট মেয়ে এবং দুইপাশে তাঁর বাবা ও মা।’
ইতিমধ্যেই শেষ ট্রেনটির হুইসেল শোনা গেল। ট্রেনটা ধীরে ধীরে প্ল্যাটফর্মে এসে ঢুকে পড়ল। ট্রেনের দরজাগুলো সবেই খোলা ছিল। হাতে গোনা কয়েকজন মাত্র যাত্রী নামল আর দুই-চারজন উঠে পড়ল। ততক্ষণে মেয়েটিও ট্রেনে ওঠার জন্য বেঞ্চ থেকে উঠে দাঁড়িয়ে পড়ল। ঠিক তখনই রহিম চাচামিয়া দৌড়ে এসে মেয়েটিকে বললেন,
“মা, চায়ের দামটা তো দিলে না!”
মেয়েটি অবাক দৃষ্টিতে তাকাল। চাচামিয়ার কথাটি শুনতেই যেন বহুদিন পরে মিষ্টি এক হাসি ফুটল তাঁর মুখে। এরপর সে বলল,
“আমার কাছে তো এখন একটি টাকাও নেই চাচা।”
রহিম চাচা হেসে হেসে বললেন,
“আচ্ছা ঠিক আছে মা, তাহলে আজ থাক্ আরেকদিন দিয়ো।”
কিন্তু এই “আরেকদিন”টা কবে ফিরে আসবে। একথাটি ভাবতেই মেয়েটির চোখের কোণায় জল চলে এলো। ট্রেনের খোলা দরজাটির দিকে সে একটিবার তাকাল, এরপর সে দাঁড়ানো অবস্থা হতে পুনরায় বসে পড়ল বেঞ্চে। ততক্ষণে ট্রেনটি চলে গেল। নির্ঘুম রাতের নীরবতা আবারও তাকে আঁকড়ে ধরলো।
এদিকে স্টেশনমাস্টার আবারও চা পান করতে রহিম চাচামিয়ার চা’য়ের দোকানে এসে হাজির হলেন। রহিম চাচামিয়া চা’য়ের কাপে চা বানাতে বানাতে লম্বা এক দীর্ঘশ্বাস ফেলে স্টেশনমাস্টারকে বলে বসলেন,
“আপনি কী জানেন স্যার? মানুষ যখন বলে, ‘কোথায় যাব জানি না,’ আসলে তখন কী আর সে কোনো ঠিকানা খোঁজে? না, বরং সে তখন নিজের ভেতরেরই গভীর অন্ধকারে হারিয়ে যায়। আর সেখান থেকে তখন তাকে ফিরিয়ে আনাটিও অনেক কঠিন হয়ে দাঁড়ায়। জানিনা, এইসব মানুষগুলোর এমন গভীর আঁধারে কবে যে আলো জ্বলবে!”
পরদিন সকালবেলা স্টেশনের প্লাটফর্মে সেই মেয়েটিকে আর দেখা যায়নি। কিন্তু চা’য়ের দোকানের টিনের বাক্সে ভাঁজ করা একটি কাগজের টুকরো ঠিকই পাওয়া গিয়েছিল। সেই কাগজে লেখা ছিল-
“শ্রদ্ধেয় চাচা, আপনার চায়ের দামটা পরে দেবো বলেছিলাম, কিন্তু দিতে পারলাম না, ক্ষমা করবেন। তবে আপনি আমাকে এমন ঋণী করেছেন, যা কোনদিনও আমি শোধ করতে পারব না। আর গত রাতের সেই শেষ ট্রেনটি আমি লজ্জায় মিস করেছি… তবে এর বিনিময়ে আমি নতুন আরেকটি দিনও ফিরে পেয়েছি।”
রহিম চাচামিয়া অশ্রুশিক্ত নয়নে কাগজের টুকরোটা তাঁর ক্যাশবাক্সের ভিতরে রেখে দিলেন। সেদিনের পর থেকে প্রতিটি রাতের শেষ ট্রেনটি আসার আগেই তিনি অতিরিক্ত এককাপ চা বানিয়ে রাখেন…যাতে আবারও যদি কোনো এক অসহায় যাত্রী এভাবেই একা কখনও বসে থাকেন, তবে তিনি সেই অতিরিক্ত বানানো চা’য়ের কাপটি বিনা-টাকায় তাকে খাওয়াবেন।
রচনাকাল: ১৭-০৮-২০২৬ইং।
মন্তব্য করুন