আন্না পাভলভনার পার্টি পুরোদমে চলছে। চারদিকে (সুতো কলের) টেকোগুলো অবিশ্রান্তভাবে গুনগুন করে চলেছে। একমাত্র ব্যতিক্রম মাসিটি। তার চিন্তাক্লিষ্ট শুকনো মুখ এই ঝলমলে জমায়েতের মাঝখানে একান্তই বেমানান। শুধু আর একটি বয়স্কা মহিলা তার পাশে বসে আছে। তাছাড়া বাকি সব লোক তিনটে দলে ভাগ হয়ে জমে গেছে। একটি দলে প্রধানত পুরুষরাই রয়েছে; তারা বসেছে মঠাধ্যক্ষকে ঘিরে। প্রধানত যুবকদের আর একটা দল প্রিন্স ভাসিলি-র মেয়ে সুন্দরী প্রিন্সেস হেলেন এবং বয়সের তুলনায় একটু মোটাসোটা খুবই সুন্দরী গোলাপবর্ণা ছোট্ট প্রিন্সেস বলকনস্কায়াকে ঘিরে বসেছে। তৃতীয় দলটা গড়ে উঠেছে মর্তেমাৎ ও আন্না পাভলভনাকে কেন্দ্র করে।
ভাইকোঁত্ সুদর্শন যুবক; নরম চোখ-মুখ, মার্জিত আচরণ; নিজেকে খ্যাতিমান মনে করলেও ভদ্রতার খাতিরে যে দলে বসেছে তার সঙ্গেই নিজেকে মানিয়ে নিয়েছে। আন্না পাভলভনারও সমবেত অতিথিদের সামনে দর্শনীয় বস্তু হিসাবেই তাকে উপস্থিত করেছে। হোটেলের কুশলী পরিবেশনকারী যেভাবে একটি বিশেষ সুখাদ্য পরিবেশন করে, আন্না পাভলভনাও সেইভাবে প্রথমে ভাইকোঁত্কে ও পরে মঠাধ্যক্ষকে বিশিষ্ট খাদ্যবস্তু হিসাবে পরিবেশন করছে। মর্তেমাৎ-এর দল সঙ্গে সঙ্গেই দুক্ দ’এনঝিন-এর হত্যা নিয়ে আলোচনা শুরু করে দিল। ভাইকোঁত্ বলল যে, দুক্ দ’এনঝিন তার নিজের উদারতার জন্যই মারা গেছে; তার প্রতি বোনাপার্তের বিদ্বেষেরও তো বিশেষ কারণ ছিল।
আন্না পাভলভনা খুশি হয়ে বলল, “তা তো বটেই। সে বিষয়ে সব কথা আমাদের বলুন ভাইকোঁত্।” ভাইকোঁত্ যে অনুরোধটি রাখতে রাজী সেটা বোঝাবার জন্য সে সহৃদয় হাসি হেসে মাথাটা নোয়ালো। সে কাহিনী সকলকে শোনাবার জন্য আন্না পাভলভনা সকলকে ডেকে একত্র করল।
জনৈক অতিথির কানে ফিস্ফিস্ করে বলল, “দুক্-এর সঙ্গে ভাইকোঁত্-এর ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল।” আরেক জনকে বলল, “কথক হিসাবেও ভাইকোঁত্ চমৎকার।” আর তৃতীয়জনকে বলল, “একেবারে সেরা মহলে যে তার চলাফেরা।”
গল্প বলবার জন্য তৈরি হয়ে ভাইকোঁত্ ঈষৎ হাসল।
প্রিয় হেলেন, তুমি এখানে এসে বস,” যে সুন্দর তরুণী প্রিন্সেসটি অন্য একটি দলের মধ্যমণি হয়ে কিছুটা দূরে বসেছিল, আন্না পাভলভনা তাকেও কাছে ডাকল।
প্রিন্সেস হাসল। অপরূপ সুন্দরী নারীর মুখের যে হাসিটি নিয়ে সে প্রথম এই ঘরে ঢুকেছিল সেই অপরিবর্তনীয় হাসিটি মুখে নিয়ে সে উঠে দাঁড়াল। পাট-করা সাদা পোশাকের ঈষৎ খসখস্ শব্দ তুলে, শুভ্র কাঁধ, চকচকে চুল, ঝলমলে হীরের দ্যুতি খেলিয়ে, প্রিন্সেস সমবেত পুরুষদের ভিতর দিয়ে এগিয়ে এল। সকলেই তাকে পথ করে দিল, কিন্তু প্রিন্সেস কারও দিকে না তাকিয়ে শুধু হাসিটি বিতরণ করে এগিয়ে চলল। সেকালের ফ্যাশান অনুসারে নিজের সুন্দর দেহ, সুঠাম কাঁধ, পিঠ ও বুককে সে এমনভাবে খুলে রেখেছে যাতে সকলেই সে সবের প্রশংসা করবার সুযোগ পায়। দেখে মনে হয়, আন্না পাভলভনার দিকে এগিয়ে যেতে যেতে সে যেন একটা নাচ-ঘরের ঝলকানি তার সঙ্গে নিয়ে চলেছে। হেলেনের রূপ এতই মোহময়ী যে তার চালচলনে কোনওরকম বাচালতার চিহ্ন তো ছিলই না, বরং দেখে মনে হলো নিজের সন্দেহাতীত বিজয়িনী রূপ সম্পর্কে সে যেন কিছুটা সংকোচগ্রস্ত। সে চায় তার রূপের প্রভাবকে খাটো করতে, কিন্তু পারে না।
যে তাকে দেখে সেই বলে, “কী চমৎকার।” ভাইকোঁত্-এর বিপরীত দিকের আসনে বসে সে যখন তার দিকে তাকিয়েও সেই অপরিবর্তনীয় হাসিটি হাসল তখন ভাইকোঁত এমনভাবে কাঁধ দুটি তুলে দুই চোখ আনত করল যেন একটা অসাধারণ কিছু দেখে সে চমকে উঠেছে।
সহাস্যে মাথাটা কাৎ করে সে বলল, “মাদাম, এ হেন শ্রোতৃবৃন্দের সামনে কিছু বলবার সামর্থ্য সম্পর্কে আমার নিজেরই সন্দেহ আছে।”
প্রিন্সেস তার উন্মুক্ত সুডৌল বাহুখানিকে একটি ছোট টেবিলের উপর রাখল; কোনও জবাব দেওয়াই প্রয়োজন মনে করল না। হেসে অপেক্ষা করতে লাগল। যতক্ষণ গল্প বলা চলল ততক্ষণই সে সোজা হয়ে বসে রইল, কখনও চোখ রাখল তার সুডৌল বাহুখানির উপর, আবার কখনও বা সুন্দর বুকের উপর দৃষ্টি রেখে হীরের নেকলেসটিকে ঠিকভাবে বসিয়ে দিল। মাঝে মাঝে পোশাকের ভাঁজগুলোকে ঠিক করে নিল; আর যখনই গল্প বেশ জমে উঠেছে তখনই আন্না পাভলভনার দিকে তাকাচ্ছে, আর তার মুখের ভাবকে নিজের মুখে ফুটিয়ে তুলতে চেষ্টা করছে; তারপর আবার ফিরে যাচ্ছে তার উজ্জ্বল হাসিতে।
ছোট প্রিন্সেসও হেলেনের দেখাদেখি চায়ের টেবিল ছেড়ে চলে এসেছিল।
“একটু অপেক্ষা করুন, আমার সেলাইটা নিয়ে আসছি।… এবার বলুন, কি ভাবছেন?” প্রিন্স হিপোলিতের দিকে ফিরে বলল। “আমার সেলাইয়ের থলেটা নিয়ে এস।”
প্রিন্সেস যখন হাসিমুখে প্রত্যেকের সঙ্গে কথা বলতে এসে বহাল তবিয়তে আসনে বসল সেই সময়টুকুতে সকলেই একবার নড়েচড়ে বসল।
“এখন আমি স্থির হয়ে বসেছি,” এই কথা বলে সেলাইটা হাতে নিয়ে সে ভাইকোঁথকে গল্প শুরু করতে বলল।
প্রিন্স হিপোলিৎ সেলাইয়ের থলেটা এনে দিয়ে দলে ভিড়ে গেল এবং একটা চেয়ার টেনে এনে ছোট প্রিন্সেসের গা ঘেঁষে বসল।
হিপোলিৎকে দেখে অবাক হতে হয়। সুন্দরী বোনটির সঙ্গে তার অসাধারণ মিল, অথচ তা সত্ত্বেও সে অত্যন্ত কুৎসিত। বোনের মতোই তার চোখ-মুখ, কিন্তু বোনের বেলায় যে মুখ আনন্দে, আত্মতৃপ্তিতে, যৌবনে সতত প্রাণবন্ত, হাসিতেও আশ্চর্য এক ধ্রুপদী দেহ-সুষমায় উজ্জ্বল, ভাইয়ের বেলায় সেই মুখ, অপদার্থতা ও আরোপিত এক বিষণ্ণ আত্মবিশ্বাসে ক্লিষ্ট; তার দেহ শীর্ণ ও দুর্বল। তার চোখ, নাক, মুখ, সবই যেন এক অর্থহীন বিষণ্ণ বিকৃতিতে ভরা; হাত ও পায়ের অবস্থান যেন সর্বদাই কেমন অস্বাভাবিক।
“একটা ভূতের গল্প বলবেন না তো?” প্রিন্সেসের পাশে বসে সে বলে উঠল। তাড়াতাড়ি সে তার চশমাটা ঠিক করে নিল, যেন এই যন্ত্রটা ছাড়া সে কিছুই শুনতে পায় না।
ঘাড় ঝাঁকুনি দিয়ে বক্তা বলল, “না, না, তা বলব না।”
“কারণ ভূতের গল্পকে আমি ঘৃণা করি,” প্রিন্স হিপোলিৎ এমন সুরে কথাটা বলল যাতে মনে হয়, নিজের মুখে উচ্চারণ করলে তবেই সে কোনও কথার অর্থ বুঝতে পারে। এত বেশি জোর দিয়ে সে কথাটা বলল যে তার বক্তব্যটা খুব বুদ্ধিদীপ্ত না অত্যন্ত বোকা-বোকা সেটাই শ্রোতারা ঠিক বুঝতে পারল না। তার পরিধানে গাঢ় সবুজ রঙের ড্রেস-কোট, হালকা রঙের ব্রীচেস, জুতো ও রেশমী মোজা।
ভাইকোঁত্ সুন্দরভাবে গল্পটি বলল। ঘটনাটি তখন খুব চলতি। দুক দ’এনঝিন গোপনে প্যারিতে গিয়েছিল মাদময়জেল জর্জের সঙ্গে দেখা করতে; সেখানে বোনাপার্তের সঙ্গে তার দেখা হয়ে যায়, বোনাপার্তও ছিল সেই বিখ্যাত অভিনেত্রীটির অনুকম্পার অংশীদার; দুক-এর উপস্থিতিতেই বোনাপার্ত তার পুরনো মূর্ছারোগে আক্রান্ত হয়ে পড়ে, এবং তার ফলে দুক-এর একেবারে হাতের মুঠোয় বসে পড়ে। কিন্তু সে বোনাপার্তকে ছেড়ে দেয়, আর পরবর্তীকালে বোনাপার্ত মৃত্যু দিয়ে সে উদারতার প্রতিদান দেয়।
গল্পটি যেমন সুন্দর, তেমনি আকর্ষণীয়, বিশেষ করে সেই জায়গাটায় যেখানে দুই প্রতিদ্বন্দী পরস্পরকে চিনতে পারে; সেখানটায় মহিলারা খুবই উত্তেজিত হয়ে পড়ল।
ছোট প্রিন্সেসের দিকে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তাকিয়ে আন্না পাভলভনা বলে উঠল, “মনোরম।”
“মনোরম।” ফিস্ ফিস্ করে কথাটা বলে ছোট প্রিন্সেসও সেলাইতে একটা ছুঁচের ফোঁড় দিল; যেন গল্পের আকর্ষণে এতক্ষণ সে সেলাইটা করতে পারছিল না।
এই নীরব প্রশংসাকে সাদরে গ্রহণ করে ভাইকোঁত্ সকৃতজ্ঞ হাসি হেসে পুনরায় গল্প শুরু করতে প্রস্তুত হতেই আন্না পাভলভনা লক্ষ্য করল যে সেই যুবকটি মঠাধ্যক্ষের সঙ্গে অত্যন্ত উদ্ধত ও সোচ্চারভাবে কথা বলে চলেছে; কাজেই সে তাড়াতাড়ি মঠাধ্যক্ষের উদ্ধারে এগিয়ে গেল। শক্তি-সাম্যের সমস্যা নিয়ে পিয়ের মঠাধ্যক্ষের সঙ্গে একটা আলোচনার সূত্রপাত করেছে, আর মঠাধ্যক্ষও যুবকটির সরলতা ও আগ্রহ দেখে নিজের প্রিয় মতবাদটি তাকে বুঝিয়ে দিচ্ছে। দু’জনই সমান আগ্রহে ও সমান স্বাভাবিকভাবে কথা বলছে ও শুনছে, আর তাতেই আন্না পাভলভনার যত আপত্তি।
মঠাধ্যক্ষ তখন বলে চলেছে, “ইওরোপের শক্তি-সাম্য এবং জনগণের অধিকারই… পথ। এখন শুধু প্রয়োজন রাশিয়ার মতো কোনও শক্তিশালী জাতি-যদিও তাকে বর্বর বলা হয়ে থাকে- নিঃস্বার্থভাবে এসে একটি মিত্র-শক্তির নেতৃত্ব গ্রহণ করুক, তার লক্ষ্য হোক ইওরোপে শক্তি-সাম্যকে অক্ষুণ্ণ রাখা; তাহলেই সে মিত্র-শক্তি পৃথিবীকে রক্ষা করতে পারবেন!”
“কিন্তু শক্তি-সাম্য কি ভাবে অক্ষুণ্ণ রাখবেন?” পিয়ের বলতে শুরু করল।
সেই মুহূর্তে আন্না পাভলভনা এসে হাজির হলো; পিয়েরের দিকে কঠোর দৃষ্টিতে তাকিয়ে ইতালীয় লোকটি জিজ্ঞাসা করল, রাশিয়ার আবহাওয়া তার কেমন লেগেছে। মুহূর্তের মধ্যে ইতালীয় লোকটির মুখের ভাব বদলে গিয়ে বেশ মিষ্টি-মিষ্টি হয়ে উঠল; মেয়েদের সঙ্গে কথা বলার সময় এটাই তার পক্ষে স্বাভাবিক।
সে বলল, “যে সমাজে অভ্যর্থনা লাভ করবার সৌভাগ্য আমার হয়েছে সেই সমাজের, বিশেষ করে এখানকার নারী সমাজের বুদ্ধি ও সংস্কৃতির উৎকর্ষ আমাকে এতই মুগ্ধ করেছে যে আবহাওয়ার কথা ভাববার মতো সময় আমি এখনও পাইনি।”
মঠাধ্যক্ষ ও পিয়েরকে পালাবার সুযোগ না দিয়ে আন্না পাভলভনা তাদের উপর নজর রাখবার সুবিধার জন্য দু’জনকে বড় দলটার মধ্যে এনে হাজির করল।
(চলমান….)
মন্তব্য করুন