প্রিয়তমা অনামিকা,
শুরুতেই তোমার প্রতি রইলো আমার হৃদয় ছোঁয়া ভালোবাসা। এই চিঠিখানা পাওয়া মাত্রই তুমি জানবে- আমি একদম ভালো নেই।
তুমি জানবে, হাসপাতালের করিডোরে সংখ্যাবিহীন কোনো এক বিছানায় শুয়ে আমি মরণ যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছি।
নিয়তির কী নির্মম পরিহাস!
ভাগ্য আমার দুটো কিডনিকেই আজ অকেজো করে দিয়েছে।
চারিদিক থেকে অভাব-অনটন আমায় ঠেসে ধরেছে, চিকিৎসা করাতে প্রয়োজন অজস্র অর্থ। অথচ আজ আমি সর্বদিক থেকেই নিঃস্ব।
ডাক্তার সাহেব বলেছেন, পরপারে পাড়ি দেবার মতো আমার হাতে আর বেশি সময়ও নেই।
হয়তো তোমার সাথে আর কোনোদিন দেখা নাও হতে পারে।
তাই পরপারে যাবার আগে তোমার কাছে আমার এই শেষ অনুরোধ-
অনামিকা,
যদি তুমি পারো, অতীতের সব অভিমানগুলো ভুলে গিয়ে অন্তত একটিবার হলেও এসে দেখে যেও আমায়।
তুমি হয়তোবা জানো না, তোমাকে এক নজর দেখার জন্য কী যে অসহ্য যন্ত্রণায় ছটফট করছি!
অনামিকা,
আমার না, ইদানীং খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে!
কিন্তু কিডনি ছাড়া কি বাঁচা সম্ভব? বলো?
এই মুহূর্তে কেউ যদি আমায় একটি কিডনি ডোনেট করতো তবে হয়তো আরও কিছুদিন আমি বেঁচে থাকার ভরসা পেতাম। কিন্তু এই দুনিয়ায় এমন দরদী মানুষজন খুব কমই আছে। আর এই কম সংখ্যক মানুষদের মাঝে এমন কাউকে খুঁজে পাওয়াটাও ভাগ্যের বিষয়।
অনামিকা,
এই জগতে তুমি ছাড়া আমার কে আছে, বলো? নেই মা, নেই বাবা, নেই ভাই-বোন, এমন কী রক্তেরও কেউ নেই। থাকবেই বা কী করে? আমার তো জন্মেরই ঠিক ঠিকানা নেই।
একমাত্র তুমিই আমার শেষ আশা ছিলে, তুমিই আমার বাঁচার শেষ ইচ্ছে ছিলে।
অনামিকা,
তুমি কি আমাকে তোমার একটি কিডনি দেবে? যাতে আমি আরও কিছুদিন বেঁচে থাকতে পারি?
জানি, দেবে না। কারণ তুমি তো আর এখন আমাকে ভালোবাসো না। তুমি এখন ভালোবাসো অন্য কাউকে, তাঁর সাথেই বেঁধেছো সুখের সংসার। একসময় তোমার প্রতি আমার অগাধ বিশ্বাস ছিল, সেই বিশ্বাসগুলো আমার মৃত্যুর আগেই মরে গেছে।
অনামিকা,
আমি চলে গেলে তুমি কি একটুও কষ্ট পাবে না? যখন তুমি শুনবে আমি আর এই দুনিয়ায় নেই? যখন রাতের আকাশে চাঁদের আলোয় একাকী বসে থাকবে, তখনও কি আমার কথা একবারও মনে পড়বে না? আমার স্পর্শ? আমার হাসি? আমার মিথ্যে অভিমানগুলো? সেসব কি ফিরে আসবে তোমার অনুভবের দুয়ারে?
অনামিকা,
আমি জানি, তুমি বেশ সুখেই আছো। আমার মতো অসহ্য ব্যথা তোমাকে ছুঁতে পারেনি। তাই হয়তোবা এই চিঠির প্রতিটি শব্দ তোমার কাছে মূল্যহীনও মনে হতে পারে। তবুও তোমায় এটুকুই জানিয়ে রাখি, শোনো….
অনামিকা,
আমি তোমায় জীবনের চেয়েও বেশি ভালোবেসেছিলাম, এখনো বাসি, মৃত্যুর শেষ মুহূর্তেও ভালোবেসেই মরে যেতে চাই।
অনামিকা,
তোমার কি মনে পড়ে? যেদিন তোমায় প্রথম দেখেছিলাম? সেদিন কী এক অপরূপ মুহূর্ত ছিল! দক্ষিণা বাতাসে তোমার মাথার রেশম কালো চুলগুলো উড়ছিল, পরনে ছিল নীল শাড়ি, দু’চোখে ছিল স্বপ্নের দৃষ্টি। যে দৃষ্টিতে আমি আমার পুরো ভবিষ্যৎটাই দেখতে পেয়েছিলাম- ছোট্ট একটি সংসার, সেই সংসারে সুখেরও কোনো অন্ত ছিল না। সবাই হিংসে করতো, আমাদের এত সুখ দেখে কেহই সহ্য করতে পারেনি, বিধাতাও না। তাই তিনি আমার কপালে লিখে দিয়ে দিলেন আজকের এই করুণ পরিণতি।
অনামিকা,
তুমি আমার হাতে হাত রেখে বলেছিলে- আমাকে তুমি কখনোই ভুলবে না। সেই প্রতিজ্ঞার মূল্য কি তবে এই নিঃসঙ্গ জীবন? জানি না কেন তুমি হঠাৎ বদলে গেলে, কেন আমায় এভাবে একা করে চলে গেলে।
আজও হাসপাতালের দেয়াল জুড়ে শুধু তোমারই স্মৃতিগুলো চোখে ভেসে ওঠে। রাত গভীর হলে তোমার মুখের সেই হাসির শব্দগুলিই শুধু শুনতে পাই, এদিক সেদিক চেয়ে দেখি তুমি নেই। শুধু একাকীত্বই আমাকে গিলে খাচ্ছে।
অনামিকা,
তুমি জানো, প্রতিটি নিঃশ্বাস নিতে আমার এখন অনেক কষ্ট হয়, তবুও প্রতিবার নিঃশ্বাস নেবার সময় খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে, শুধু তোমাকে শেষ একটিবার দেখার জন্য।
যদি তুমি একটিবার এসে বলতে “আমি ভুল করেছিলাম”, তবে হয়তো আমার এই অসহ্য মরণ যন্ত্রণাটা চিরতরে মুক্তি পেত। আমি জানি, তুমি আসবে না। তোমার নতুন জীবন আমাকে কবেই ভুলে গেছে।
তবুও যদি কখনো কোনো এক রাতে, কিছু নিজের ভুলে অথবা অন্য কোনো ব্যতিক্রমী বিরহের অগোচরে কখনো কোথাও একাকী বসে থাকো….
ধরো, আধো-আধো জোছনার আলোয়, হঠাৎ থমকে যাওয়া হাওয়ায়!
তখন ঐ সময়, ঐ মুহূর্তে যদি ইচ্ছে হয়- তুমি তোমার অনুভবের বদ্ধ দুয়ারটা অন্তত একটিবার হলেও খুলে দেখো নিও, দেখবে, সেই ঘরে কেউ একজন বন্দির শিকল পায়ে লাশ হয়ে পড়ে আছে। যে তোমাকে নিজের জীবনের থেকেও বেশি ভালোবাসতো!
রচনাকাল: ১৩-০৮-২০২৬ ইং।
মন্তব্য করুন