সেদিন সকালে উঠে মনের আঙিনায় বড় অস্বস্তি হয়ে বিশ্বাসের বন্ধনে মনকে চঞ্চল করে তুললাম। শুনতে সকলকে অবাক লাগলেও নিজের মনকে স্থির না রাখতে পেরে খাতার পাতায় লিখতে শুরু করলাম। ছোটবেলার সেই দিনের কথা, যেটা এখনো স্মৃতির প্রেক্ষাপটে দোদুল্যমান হয়ে উঠছে। সত্যিই জীবনটা যেন রঙ্গমঞ্চে লাট্টুর মতো ঘুরতে ঘুরতে চলছে ঘোর অন্ধকারের দিকে। গুরুকুলে শিক্ষার মাধ্যমে মুক্ত মনকে বিচলিত করে তুলেছে এই জীবনের সময় তার প্রতি ক্ষণে ক্ষণে।
তখন ক্লাস ফাইভের কথা, যেটা টিচারকে আমার খুব বিরক্ত বোধ লাগতো। মনে হতো জীবনের সবথেকে বড় শত্রু হিসাবে চিহ্নিত ছিলেন। কচুপাতার জলের মতো নিজেকে টলমল খেতে থাকতাম। শুধু বন্ধু ছাড়া কেউ নেই। কারণ সেই সময় বয়স অনুপাতে কিশোর মনে পড়ালেখা যেন একটা কঠিন কাজ। বাবা মায়ের দৃষ্টির সীমানায় থাকাটাও নিছক জেলখানার মতো লাগতো। সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা ও সময় কাটাতে আজাদ মন প্রফুল্ল হয়ে উঠতো। কিন্তু স্কুল যাওয়ার সময় হলে সময়ের ভাবনাটি সঠিকভাবে পালন করতে হতো। বাড়িতে গুরুজনদের খুব টাইট শাসন ও উপদেশ ছিল। সময়োপযোগে বাড়ির বড়দের সিদ্ধান্তই সর্বোপরি সেই সময়। এদিকে টিচারের ডাঁট ও পড়াশোনার মনোযোগে চঞ্চল মন বিচলিত হয়ে উঠতো, কি করি আর কি করবো ভেবে উঠতে পারতাম না।
আজ বুঝতে পারছি সেই দিনগুলো কেমন ছিল। তাই পিতা মাতা অভিভাবক তাঁরা কতটা দায়িত্ব পালন করতেন, আজ তিলে তিলে বুঝতে পারছি। আগের জীবনকে সুখী হওয়ার জন্য তখন অপেক্ষা করতেন জ্ঞানের প্রদীপের আলোটা কিভাবে জ্বলবে। সময় পরিবর্তনে ফুটে ওঠে তার ভবিষ্যৎ। আজ যে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তার অনুপ্রেরণার সমীকরণে আমি দাঁড়িয়ে আছি, আমার ওই টিচারকে শত শত নমন। আজও মনে মনে হচ্ছে তাঁর কষাঘাত ভালোবাসা আমাকে শিক্ষার গণ্ডি মাপে আলো দেখিয়েছেন। তাঁর শিক্ষার গতি প্রগতির গুণাবলীর জ্ঞানের মাধ্যমে। আমি যে সময় তাঁকে সংকুচিত মনে দেখতাম, কারণ ক্লাসে ঢুকেই সোজা আমার দিকে দৃষ্টিপাত করতেন। তিনি ছিলেন আমার বাবার বন্ধু বা ক্লাস ফ্রেন্ড, সব সময় নজরটা আমার উপরেই থাকতো, সেই সময় মনে হতো কেন উনি আমাকে চোখে হারাতেন না। একদিন এবসেন্ট করলে খুব পানিশমেন্ট দিতেন এবং প্রথম প্রশ্ন করতেন, পড়ালেখা করে এসেছো? নত মস্তকে মাথা নাড়িয়ে বলতাম হ্যাঁ স্যার হ্যাঁ। কিন্তু ওই সময় যদি ভুল হতো মারটা মাটিতে পড়তো না, যেন বাঁদর খেলা খেলাতেন।
সেই সময়টা আজও নিজেকে মনের কষ্টের দাঁড়িপাল্লায় রেখে ওজন করতে থাকি আর বলতে থাকি আমি কি পারব সেই দিনের বিরল সময়টা ফিরিয়ে আনতে? যাঁদের কারণে সমাজে মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছি, তাঁর আদর্শ পেয়ে এখন সেই কিঞ্চিৎ জ্ঞানের মাধ্যমে সুষ্ঠু পরিবেশে উপার্জন করতে সক্ষম হয়েছি। আছি বর্তমানে দিল্লিতে ছোট্ট একটু ব্যবসায় লিপ্ত। তাই মনের গভীরে সবসময় উত্তাল তরঙ্গে হাবুডুবু খেতে থাকি। মনে হয় যদি কোন দিন তাঁর সেবা করতে সক্ষম হতাম বা তাঁকে স্মৃতির প্রেক্ষাপটে অনুপ্রেরণার চন্দন দিয়ে পদধূলির টিকা লাগিয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করতাম। কিন্তু স্কুল লাইফ হতে আজ পর্যন্ত সাক্ষাৎ করতে পারি নি কর্মের স্বার্থে। শিক্ষাগুরুর ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াই। একদিন বাড়িতে এলাম চার পাঁচ দিন বাড়িতে থাকতে সময়ও পেলাম, কোন দিন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় নাই, নিজের মনকে শুধু কষতে থাকতাম। হয়তো এই জনমে আর দেখা নাও হতে পারে। বিধাতার বিধান ভাগ্যের পরিহাস কেউ খণ্ডন করতে পারে না। পারতাম না নিজেকে মেনে নিতে।
হঠাৎ একদিন ঈশ্বর সেটাও পূরণ করে দিলেন। একদিন ব্যাংকে গিয়েছিলাম সেদিন ছিল শুক্রবার, দেখি আমার ওই শিক্ষাগুরু ব্যাংকে টাকা উইথড্র করার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি আচম্বিত হয়ে নিজেকে স্থির না রাখতে পেরে নয়নে টলমল অশ্রুতে দেখতে পেলাম ওনার মুখমণ্ডল। তাঁর কাছে নতমস্তক হয়ে প্রণাম করে মনকে শান্তির সাগরে ভাসিয়ে দিলাম। ছলছল নয়ন জলে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম স্যার এখানে এসেছেন? তিনি আমাকে বললেন হ্যাঁ বাবা কিছু টাকা উঠাতে এসেছি। আমি খুশি মনে বললাম স্যার আমি আপনার লাইনে দাঁড়াচ্ছি, আপনি ওই চেয়ারে বসে থাকেন। আপনার টাকাটা আমি উইথড্র করে দিচ্ছি। ব্যাংকের ক্যাশিয়ার সজল চোখে চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন আমাদের গুরু শিষ্যের আন্তরিকতার মৃত সঞ্জীবনী। ওই সময়টা আমার কাছে স্বর্গের সুখ অনুভব হচ্ছিল। তাঁর অনুশাসন আজও পর্যন্ত আমি প্রত্যেক ক্ষণে ক্ষণে পালন করতে থাকি। যে শিক্ষা বা অনুশাসনের গণ্ডিতে বেঁধে মানুষ করেছেন তাঁর ঋণ পরিশোধ করতে পারবো না।
কিছুক্ষণ পরে ক্যাশ কাউন্টার হতে ক্যাশগুলো হাতে তুলে দিতেই উনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন তুমি তো আমার সেই ছাত্র, আজও পর্যন্ত মনে রেখেছো। অনেকেই মনে রাখে না বাবা। এই বলে তাঁর কোমল হাত দুটি আমার মাথায় রেখে আশীর্বাদ করলেন, বললেন বাবা তুমি সুখে থেকো।
আমার দুই চোখ অশ্রুতে ভরে গেল। তারপর সেই ক্যাশ কাউন্টারের পেছনে লাইন দিলাম। এই সব দেখে ক্যাশিয়ার একটি ছেলের দ্বারা আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি বললাম স্যার বলুন। তিনি আমাকে বললেন আপনি একই সঙ্গে আপনার টাকাটা তুলে নিতে পারতেন। আমি বললাম স্যার এটা রুল ফলো হচ্ছে না, ওই শিক্ষাগুরু আমাকে অনুকরণ শিখিয়েছেন, তাই এটা আমি করতে পারি নি। তিনি এই কথা শুনে আমাকে হ্যান্ডশেক করে বললেন আপনি খুবই ভালো মনের মানুষ। ধন্য আপনার জীবন। আপনার কাছে একটা শিক্ষা পেলাম।
প্রকাশ: ২০২৫ইং।
সেদিন সকালে উঠে মনের আঙিনায় বড় অস্বস্তি হয়ে বিশ্বাসের বন্ধনে মনকে চঞ্চল করে তুললাম। শুনতে সকলকে অবাক লাগলেও নিজের মনকে স্থির না রাখতে পেরে খাতার পাতায় লিখতে শুরু করলাম। ছোটবেলার সেই দিনের কথা, যেটা এখনো স্মৃতির প্রেক্ষাপটে দোদুল্যমান হয়ে উঠছে। সত্যিই জীবনটা যেন রঙ্গমঞ্চে লাট্টুর মতো ঘুরতে ঘুরতে চলছে ঘোর অন্ধকারের দিকে। গুরুকুলে শিক্ষার মাধ্যমে মুক্ত মনকে বিচলিত করে তুলেছে এই জীবনের সময় তার প্রতি ক্ষণে ক্ষণে।
তখন ক্লাস ফাইভের কথা, যেটা টিচারকে আমার খুব বিরক্ত বোধ লাগতো। মনে হতো জীবনের সবথেকে বড় শত্রু হিসাবে চিহ্নিত ছিলেন। কচুপাতার জলের মতো নিজেকে টলমল খেতে থাকতাম। শুধু বন্ধু ছাড়া কেউ নেই। কারণ সেই সময় বয়স অনুপাতে কিশোর মনে পড়ালেখা যেন একটা কঠিন কাজ। বাবা মায়ের দৃষ্টির সীমানায় থাকাটাও নিছক জেলখানার মতো লাগতো। সমবয়সী বন্ধুদের সঙ্গে খেলাধুলা ও সময় কাটাতে আজাদ মন প্রফুল্ল হয়ে উঠতো। কিন্তু স্কুল যাওয়ার সময় হলে সময়ের ভাবনাটি সঠিকভাবে পালন করতে হতো। বাড়িতে গুরুজনদের খুব টাইট শাসন ও উপদেশ ছিল। সময়োপযোগে বাড়ির বড়দের সিদ্ধান্তই সর্বোপরি সেই সময়। এদিকে টিচারের ডাঁট ও পড়াশোনার মনোযোগে চঞ্চল মন বিচলিত হয়ে উঠতো, কি করি আর কি করবো ভেবে উঠতে পারতাম না।
আজ বুঝতে পারছি সেই দিনগুলো কেমন ছিল। তাই পিতা মাতা অভিভাবক তাঁরা কতটা দায়িত্ব পালন করতেন, আজ তিলে তিলে বুঝতে পারছি। আগের জীবনকে সুখী হওয়ার জন্য তখন অপেক্ষা করতেন জ্ঞানের প্রদীপের আলোটা কিভাবে জ্বলবে। সময় পরিবর্তনে ফুটে ওঠে তার ভবিষ্যৎ। আজ যে শিক্ষায় শিক্ষিত হয়ে তার অনুপ্রেরণার সমীকরণে আমি দাঁড়িয়ে আছি, আমার ওই টিচারকে শত শত নমন। আজও মনে মনে হচ্ছে তাঁর কষাঘাত ভালোবাসা আমাকে শিক্ষার গণ্ডি মাপে আলো দেখিয়েছেন। তাঁর শিক্ষার গতি প্রগতির গুণাবলীর জ্ঞানের মাধ্যমে। আমি যে সময় তাঁকে সংকুচিত মনে দেখতাম, কারণ ক্লাসে ঢুকেই সোজা আমার দিকে দৃষ্টিপাত করতেন। তিনি ছিলেন আমার বাবার বন্ধু বা ক্লাস ফ্রেন্ড, সব সময় নজরটা আমার উপরেই থাকতো, সেই সময় মনে হতো কেন উনি আমাকে চোখে হারাতেন না। একদিন এবসেন্ট করলে খুব পানিশমেন্ট দিতেন এবং প্রথম প্রশ্ন করতেন, পড়ালেখা করে এসেছো? নত মস্তকে মাথা নাড়িয়ে বলতাম হ্যাঁ স্যার হ্যাঁ। কিন্তু ওই সময় যদি ভুল হতো মারটা মাটিতে পড়তো না, যেন বাঁদর খেলা খেলাতেন।
সেই সময়টা আজও নিজেকে মনের কষ্টের দাঁড়িপাল্লায় রেখে ওজন করতে থাকি আর বলতে থাকি আমি কি পারব সেই দিনের বিরল সময়টা ফিরিয়ে আনতে? যাঁদের কারণে সমাজে মাথা তুলে দাঁড়াতে সক্ষম হয়েছি, তাঁর আদর্শ পেয়ে এখন সেই কিঞ্চিৎ জ্ঞানের মাধ্যমে সুষ্ঠু পরিবেশে উপার্জন করতে সক্ষম হয়েছি। আছি বর্তমানে দিল্লিতে ছোট্ট একটু ব্যবসায় লিপ্ত। তাই মনের গভীরে সবসময় উত্তাল তরঙ্গে হাবুডুবু খেতে থাকি। মনে হয় যদি কোন দিন তাঁর সেবা করতে সক্ষম হতাম বা তাঁকে স্মৃতির প্রেক্ষাপটে অনুপ্রেরণার চন্দন দিয়ে পদধূলির টিকা লাগিয়ে আমি নিজেকে ধন্য মনে করতাম। কিন্তু স্কুল লাইফ হতে আজ পর্যন্ত সাক্ষাৎ করতে পারি নি কর্মের স্বার্থে। শিক্ষাগুরুর ঋণের বোঝা মাথায় নিয়ে ঘুরে বেড়াই। একদিন বাড়িতে এলাম চার পাঁচ দিন বাড়িতে থাকতে সময়ও পেলাম, কোন দিন তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় নাই, নিজের মনকে শুধু কষতে থাকতাম। হয়তো এই জনমে আর দেখা নাও হতে পারে। বিধাতার বিধান ভাগ্যের পরিহাস কেউ খণ্ডন করতে পারে না। পারতাম না নিজেকে মেনে নিতে।
হঠাৎ একদিন ঈশ্বর সেটাও পূরণ করে দিলেন। একদিন ব্যাংকে গিয়েছিলাম সেদিন ছিল শুক্রবার, দেখি আমার ওই শিক্ষাগুরু ব্যাংকে টাকা উইথড্র করার জন্য লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন। আমি আচম্বিত হয়ে নিজেকে স্থির না রাখতে পেরে নয়নে টলমল অশ্রুতে দেখতে পেলাম ওনার মুখমণ্ডল। তাঁর কাছে নতমস্তক হয়ে প্রণাম করে মনকে শান্তির সাগরে ভাসিয়ে দিলাম। ছলছল নয়ন জলে তাঁকে জিজ্ঞাসা করলাম স্যার এখানে এসেছেন? তিনি আমাকে বললেন হ্যাঁ বাবা কিছু টাকা উঠাতে এসেছি। আমি খুশি মনে বললাম স্যার আমি আপনার লাইনে দাঁড়াচ্ছি, আপনি ওই চেয়ারে বসে থাকেন। আপনার টাকাটা আমি উইথড্র করে দিচ্ছি। ব্যাংকের ক্যাশিয়ার সজল চোখে চশমার উপর দিয়ে তাকিয়ে তাকিয়ে দেখছেন আমাদের গুরু শিষ্যের আন্তরিকতার মৃত সঞ্জীবনী। ওই সময়টা আমার কাছে স্বর্গের সুখ অনুভব হচ্ছিল। তাঁর অনুশাসন আজও পর্যন্ত আমি প্রত্যেক ক্ষণে ক্ষণে পালন করতে থাকি। যে শিক্ষা বা অনুশাসনের গণ্ডিতে বেঁধে মানুষ করেছেন তাঁর ঋণ পরিশোধ করতে পারবো না।
কিছুক্ষণ পরে ক্যাশ কাউন্টার হতে ক্যাশগুলো হাতে তুলে দিতেই উনি কাঁপা কাঁপা গলায় বললেন তুমি তো আমার সেই ছাত্র, আজও পর্যন্ত মনে রেখেছো। অনেকেই মনে রাখে না বাবা। এই বলে তাঁর কোমল হাত দুটি আমার মাথায় রেখে আশীর্বাদ করলেন, বললেন বাবা তুমি সুখে থেকো।
আমার দুই চোখ অশ্রুতে ভরে গেল। তারপর সেই ক্যাশ কাউন্টারের পেছনে লাইন দিলাম। এই সব দেখে ক্যাশিয়ার একটি ছেলের দ্বারা আমাকে ডেকে পাঠালেন। আমি বললাম স্যার বলুন। তিনি আমাকে বললেন আপনি একই সঙ্গে আপনার টাকাটা তুলে নিতে পারতেন। আমি বললাম স্যার এটা রুল ফলো হচ্ছে না, ওই শিক্ষাগুরু আমাকে অনুকরণ শিখিয়েছেন, তাই এটা আমি করতে পারি নি। তিনি এই কথা শুনে আমাকে হ্যান্ডশেক করে বললেন আপনি খুবই ভালো মনের মানুষ। ধন্য আপনার জীবন। আপনার কাছে একটা শিক্ষা পেলাম।
প্রকাশ: ২০২৫ইং।
মন্তব্য করুন