কখনো কখনো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় পরিবর্তনগুলো শুরু হয় খুব ছোট কোনো জায়গা থেকে- কোনো বিশাল কর্পোরেট অফিস থেকে নয়, কোনো বিলাসবহুল গবেষণাগার থেকেও নয়; বরং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ছোট কক্ষ, কয়েকজন তরুণ, কিছু কম্পিউটার এবং একটি অসম্ভব মনে হওয়া ধারণা থেকে।
ফেসবুকের গল্পটিও ঠিক তেমন।
আজ Facebook শুধু একটি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের নাম নয়। এর পেছনে রয়েছে Meta নামের একটি বিশাল প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান। কিন্তু এই বিশালতার শুরু হয়েছিল ২০০৪ সালে, যখন হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক তরুণ ছাত্র মার্ক জাকারবার্গ একটি ছোট ওয়েবসাইট তৈরি করেছিলেন।
১. কষ্টের শুরু - ডরমেটরির সেই ছোট ঘর
২০০৪ সালের শীত। হার্ভার্ডের কার্কল্যান্ড হাউজের H33 নম্বর ডরমেটরি। সেখানে দিনরাত এক করে কোড লিখছেন ১৯ বছরের এক তরুণ। তার ঘরে কোনো এসি নেই, ভালো চেয়ার নেই, শুধু একটি ল্যাপটপ আর ইন্টারনেট। বন্ধুরা যখন পার্টিতে ব্যস্ত, তখন তিনি একা একা সার্ভারের Error ঠিক করছেন। প্রথম দিকে Facebook বারবার ক্র্যাশ করত। একসাথে ১০০ জন লগইন করলেই সাইট ডাউন হয়ে যেত। জাকারবার্গ নিজের পকেটের টাকা দিয়ে সার্ভার ভাড়া করতেন।
২. Facemash - প্রথম বড় ধাক্কা
Facebook-এর আগে তিনি তৈরি করেছিলেন Facemash। হার্ভার্ডের সার্ভার থেকে ছাত্রদের ছবি নিয়ে এই সাইট বানানোর জন্য হার্ভার্ড প্রশাসন তাকে শাস্তির মুখে ফেলে। তাকে ডিসিপ্লিনারি বোর্ডে যেতে হয়। অনেকেই ভেবেছিল তার ক্যারিয়ার এখানেই শেষ। কিন্তু এই বিতর্কই তাকে শিখিয়েছিল- প্রযুক্তি দিয়ে মানুষের মনোযোগ কত দ্রুত আকর্ষণ করা যায়।
৩. TheFacebook.com এর জন্ম
ব্যর্থতা আর বিতর্ক পেছনে ফেলে ২০০৪ সালের জানুয়ারিতে তিনি নতুন কোড লেখা শুরু করেন। ৪ ফেব্রুয়ারি ২০০৪ রাতে জন্ম নেয় TheFacebook.com। প্রথম ২৪ ঘণ্টায় ১২০০ হার্ভার্ড শিক্ষার্থী রেজিস্ট্রেশন করে। এটা ছিল তার জীবনের প্রথম সফলতার আলো।
৪. একা নয় - বন্ধুদের সহযোগিতা
Facebook শুধু একজনের তৈরি নয়। জাকারবার্গের সঙ্গে ছিলেন:
- Eduardo Saverin - ব্যবসায়িক ও আর্থিক দিক
- Dustin Moskovitz - প্রোগ্রামিং ও প্রযুক্তি
- Andrew McCollum - ডিজাইন
- Chris Hughes - যোগাযোগ ও প্রচার
কিন্তু বন্ধুদের সাথে কাজ করাটাও সহজ ছিল না। Eduardo Saverin এর সাথে টাকা নিয়ে মনোমালিন্য হয়, পরে মামলা পর্যন্ত গড়ায়। প্রথম দিকে কোনো বেতন ছিল না, সবাই বিনা পয়সায় কাজ করত।
৫. কিভাবে ফেসবুক ছড়িয়ে দিলেন - তার বিস্তারের কৌশল
জাকারবার্গ চাইলেই একদিনে সারা বিশ্বের জন্য খুলে দিতে পারতেন, কিন্তু তিনি তা করেননি। তিনি এক দুর্লভ কৌশল নিয়েছিলেন:
ধাপ ১: আইভি লিগ দখল: প্রথমে শুধু হার্ভার্ড। তারপর ২০০৪ সালের মার্চে একে একে Stanford, Columbia, Yale। এতে অন্য বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রদের মধ্যে আকাঙ্ক্ষা তৈরি হয়— “আমাদের কবে দেবে?”
ধাপ ২: FOMO তৈরি: যখন একটি ক্যাম্পাসে Facebook চালু হতো, তখন সেই ক্যাম্পাসের ৮০% ছাত্র ১ সপ্তাহের মধ্যে যোগ দিত। কারণ তাদের বন্ধু সেখানে আছে। এটাই ছিল তার আসল মার্কেটিং।
ধাপ ৩: Palo Alto যাত্রা: ২০০৪ সালের গ্রীষ্মে পড়াশোনা ছেড়ে তিনি এবং তার টিম একটি ছোট বাড়ি ভাড়া নিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার Palo Alto-তে চলে যান। সেই বাড়িতেই ছিল অফিস, ঘুমানোর জায়গা, সবকিছু। গরমে সিদ্ধ হতে হতে তারা কোড লিখতেন।
৬. প্রথম বড় বিনিয়োগ ও বিক্রি না করার কষ্ট
২০০৪ সালে সার্ভার চালানোর টাকা শেষ। তখন Peter Thiel $500,000 বিনিয়োগ করেন। এই অর্থই Facebook-কে বড় করার সুযোগ করে দেয়।
২০০৫ সালে Yahoo! ১ বিলিয়ন ডলারে Facebook কিনতে চায়। ২১ বছরের একটি ছেলের জন্য ১ বিলিয়ন ডলার মানে অকল্পনীয়। বোর্ডের অনেকেই বিক্রি করতে বলেছিল, কিন্তু জাকারবার্গ বলেন- “এটা তো কেবল শুরু, আমি একটি সাম্রাজ্য বানাতে চাই।” এই সিদ্ধান্ত নিতে তাকে প্রচণ্ড মানসিক চাপ সহ্য করতে হয়।
৭. TheFacebook থেকে Facebook
২০০৫ সালে $200,000 দিয়ে facebook.com ডোমেইন কেনা হয় এবং নাম থেকে “The” বাদ দেওয়া হয়। TheFacebook.com থেকে হয়ে যায় Facebook। ছোট পরিবর্তন, কিন্তু ব্র্যান্ডের জন্য বিশাল পদক্ষেপ।
২০০৬ সালের এপ্রিলে Facebook ঘোষণা করে তারা $25 million বিনিয়োগ সংগ্রহ করেছে এবং ব্যবহারকারী তখন সাত মিলিয়নেরও বেশি। ২০০৬ সালের ২৬ সেপ্টেম্বর Facebook সবার জন্য উন্মুক্ত করে দেওয়া হয়। তখন থেকেই শুরু হয় আসল বিশ্বজয়।
৮. News Feed - আরেকটি বড় পরিবর্তন
News Feed চালু হলে প্রথমে সবাই খুশি হয়নি, গোপনীয়তা নিয়ে প্রতিবাদ হয়। লাখ লাখ মানুষ প্রতিবাদ করে। কিন্তু Facebook পিছিয়ে যায়নি, বরং ব্যবহারকারীর প্রতিক্রিয়া শুনে সেটিকে উন্নত করেছে।
৯. বিলিয়ন ব্যবহারকারীর পথে
Facebook দ্রুত বিশ্বের বিভিন্ন দেশে ছড়িয়ে পড়ে। আজ Meta-এর তথ্য অনুযায়ী, তাদের বিভিন্ন পণ্য ৩ বিলিয়নেরও বেশি মানুষ ব্যবহার করে।
১০. ভবিষ্যতের দিকে বাজি
জাকারবার্গ বুঝেছিলেন, ভবিষ্যৎ শুধু নিউজফিডে নয়।
- ২০১২ সালে Instagram অধিগ্রহণ - $1 বিলিয়ন
- ২০১৪ সালে WhatsApp অধিগ্রহণ - $19 বিলিয়ন
- ২০১৪ সালে Oculus VR অধিগ্রহণ - $2 বিলিয়ন
১১. সবচেয়ে বড় আঘাত ও শিক্ষা
Facebook-এর ইতিহাস শুধু সাফল্যের নয়, বিতর্কেরও। বিশেষ করে Cambridge Analytica বিতর্ক Facebook-এর ইতিহাসে অন্যতম বড় সংকট। ৮৭ মিলিয়ন ব্যবহারকারীর তথ্য ফাঁসের অভিযোগে তাকে মার্কিন কংগ্রেসে ১০ ঘণ্টা জেরার মুখে পড়তে হয়। এটা ছিল তার জীবনের সবচেয়ে অপমানজনক ও কষ্টের সময়।
২০২১ সালে মূল কোম্পানির নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় Meta Platforms। এটি ছিল Metaverse-এর দিকে যাত্রার ঘোষণা।
১২. জাকারবার্গের ৭টি বড় সংগ্রাম
তার কষ্ট শুধু রাত জেগে কোড লেখা নয়:
১. ধারণাকে বাস্তবে রূপ দেওয়া
২. ব্যবহারকারী ধরে রাখা
৩. প্রযুক্তিগত সমস্যা সামলানো
৪. অর্থের ব্যবস্থা করা
৫. সঠিক মানুষ খুঁজে নেওয়া
৬. সমালোচনা সামলানো
৭. নিজেকে পরিবর্তন করা - প্রোগ্রামার থেকে CEO হওয়া
২০০৬ সালে Forbes-কে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছিলেন, শুরুতে তিনি মূলত “cool things” তৈরি করতে চেয়েছিলেন।
শেষ কথা: একটি কোড থেকে শুরু হওয়া বিপ্লব
২০০৪ সালে হার্ভার্ডের একটি ছোট কক্ষ থেকে শুরু হওয়া TheFacebook আজকের পৃথিবীর অন্যতম প্রভাবশালী প্রযুক্তি-গল্প। শুরুতে ছিল কয়েকজন তরুণ, কয়েকটি কম্পিউটার, সীমিত অর্থ, অসংখ্য অনিশ্চয়তা। কিন্তু ছিল একটি জিনিস- একটি ধারণাকে বাস্তবে পরিণত করার প্রবল ইচ্ছা।
বড় শিক্ষা হলো:
- ছোট সমস্যাকে ছোট ভাবা উচিত নয়
- প্রযুক্তি শুধু জ্ঞান নয়, প্রয়োগ
- দ্রুত পরীক্ষা করা গুরুত্বপূর্ণ
- বড় স্বপ্নের সঙ্গে ঝুঁকিও থাকে
- একা বড় প্রতিষ্ঠান তৈরি করা যায় না
বড় কোনো প্রতিষ্ঠান সাধারণত বড় আকারে জন্ম নেয় না। অনেক সময় সেটি জন্ম নেয় একটি ছোট ঘরে, কয়েকজন মানুষের হাতে, একটি সাধারণ সমস্যার সমাধান হিসেবে। ২০০৪ সালের ৪ ফেব্রুয়ারির সেই ছোট্ট TheFacebook আজ আর ছোট নেই, কিন্তু শুরুটা মনে রাখলে বোঝা যায়- বিশ্বজয়ী প্রযুক্তি সাম্রাজ্যের প্রথম পদক্ষেপটিও একদিন ছিল মাত্র ছোট্ট একটি ওয়েবসাইট।
তথ্যসূত্র: Meta Company History, Forbes Archive
প্রকাশ: ০৯-০৯-২০২৬ইং।
মন্তব্য করুন