বি আর টি সি। রাজশাহী-দিনাজপুরে যাবার সরাসরি যোগাযোগ মাধ্যম বলতে আক্ষরিক অর্থে এটিই শুধুমাত্র। বাসে তুলে দিতে আসা হাজবেন্ডকে জানালায় হাত নেড়ে বিদায় জানাতে গিয়ে জানালার পাশের সিটে বসা সহযাত্রীর সাথে চোখাচোখি হলো। দৃষ্টিতে হাসির ছটা, স্বাগত জানালো যেন। পরনে থ্রি পিস। ওড়নায় আধো ঘোমটায় ঢাকা মুখখানি প্রথম দেখাতেই স্বস্তি জাগালো লম্বা সময়ের সহায়ক ভেবে।
আলো ফোটা ভোরে ছুটে চলেছে বি আর টি সি চারপাশের নিস্তব্ধতা চিরে। দুপাশে বন্ধ দোকানপাট, যান চলাচলের অপ্রতুলতা। কিছুদূর পরপর সদ্য জেগে ওঠা গ্রামের টুকরো টুকরো ছবি। কখনো বা গাড়ির সাথে তাল মিলিয়ে গাছপালা, সবুজ ক্ষেত, ছোট বড় জলাশয় ছুটছে সঙ্গী হয়ে। সাধারণত জার্নির এই লম্বা মুহূর্তগুলোর একাকিত্বে বরাবরই সঙ্গী হয় বহুদিন ধরে শেষ করতে না পারা অসমাপ্ত কোনো গল্পের বই কিংবা জমানো ঈদসংখ্যাগুলোর যে কোনোটা।
কিন্তু আজ সঙ্গে নেই কোনোটাই। প্রস্তুতি ছাড়াই আজ আমি আমার বাবার বাড়ি রওনা হয়েছি। বরাবরের আনন্দবাড়ি আমার বাবার বাড়ি যাচ্ছি আমি নিরানন্দ মনে, চিন্তাচ্ছন্ন হয়ে। কিছুদিন থেকেই বাবার শ্বাসকষ্টটা বেড়েছে। ফোনেই বলেন, এবার কিছুতেই স্বস্তি হচ্ছে না। মাঝে কথাও হয় না। কথা বললে বাড়ে। গত পরশু স্ক্রিনে আব্বা কলিং ভেসে উঠতে খুশি মনে ফোনটা কানে দিয়ে বলি, আব্বা?
আব্বার জবাব শুনে অস্থির হই, কথা বলতে নিবৃত্ত করি উপর্যুপরি অনুরোধ করে বলি,
» আব্বা পরে কথা বলবো। শ্বাসকষ্টটা বেড়েছে, কথা বলতে কষ্ট হচ্ছে আব্বা।
তাগাদা দিয়ে বলি, ইনহেলার নিতে, নেবুলাইজার নিতে। প্রথমটায় না চাইলেও অবশেষে আব্বা থেমে যান। মনটা চঞ্চল হয়। পরদিন খবর জানতে চাইলে আব্বা ক্লিনিকে যাচ্ছেন এটুকুই জানতে পারি।
মনটায় ঝাপটা লাগে জোরে। সান্ত্বনা দেই নিজেকে। হয়তো শ্বাসকষ্টের কারণে অক্সিজেনের স্বল্পতা বোধ করছেন আব্বা। গতবারের মতো সুস্থ হয়ে ফিরবেন। গুরুতর কারণ হলে তো কেউ না কেউ জানাতো।
হায়রে সংসার, মায়া নাকি মোহ। আষ্টেপৃষ্ঠে বেঁধে সে কি ব্যস্ততা। অহেতুক আর অযথা। বাবা মা সারাটা জীবন এমনি ব্যস্ততায় তো আমাকেও পেলে পুষে বড়টি করলেন, প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় শিক্ষিত(!) করলেন, পাত্রস্থ করলেন। সংসার গড়ে দিলেন মনের মতো।
কিন্তু তাঁদের অখণ্ড অবসরে দুটো দিন সময় দিতে ছুটে যাইনি। জীবনভর পরিশ্রম শেষে ক্লান্ত দিনগুলিতে একটু যত্ন আত্তির পরশ কবার বুলিয়েছি বাবা মায়ের কাছটিতে বসে?
ছয় ঘণ্টার সময় সাঁতরে কেন পৌঁছাইনি বাবা মায়ের মাঝখানটিতে বসে টুংটাং শব্দ তুলে ঈষদুষ্ণ হরলিক্সের মগ হাতে তুলে দিতে কিংবা গরম স্যুপের বাটিতে ছোট ছোট চুমুক, নিদেনপক্ষে ধোঁয়া ওঠা আদা চায়ের সাথে বাবা মায়ের স্মৃতি রোমন্থনের সময়টাকে আনন্দঘন করতে।
নিজের সংসার সন্তানদের সুবিধা বুঝে বছরান্তে আঙুল গোনা সময় নিয়ে বাবা মায়ের কাছে যাই। নির্লজ্জভাবে দায়িত্বহীনতার দায়িত্বজ্ঞান দেখাই। আরও দুটো দিন থাকার আকুতি মাড়িয়ে চলে আসি সংসারের অমোঘ টানে।
দিনমান ফাঁকা বাড়িটা। জীবন জীবিকায় ব্যস্ত সবাই। হাতের কাছে খাবার এগিয়ে দেয়া, গরম পানিটা সময়মতো দেয়া, টেবিলটা রেডি করা, এই মৌলিক প্রয়োজনগুলো একান্ত দরকার। পুরনো কাজের মানুষগুলোকে অনুরোধ করি সময়মতো আসতে, বাড়তি পারিশ্রমিকের টোপ দেখাই।
রশিদা, মজনুরা অনুরোধের ঢেঁকি গিলে। ফলাফলে কখনও আসে। কখনও সকাল গড়িয়ে দুপুর গড়ায় অপেক্ষার সবকটি প্রহর গড়িয়েও অনুপস্থিত থাকে। বাবা মায়ের অসহায়ত্ব দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়।
জার্নির একাকিত্বে মনে ভিড় করে অপরাধবোধের চিত্রাংশ। সহযাত্রীর মুহুর্মুহু ফোনালাপে চিন্তাচ্ছেদ ঘটে। দৃষ্টি বিনিময় হয়, হয় আলাপচারিতাও।
বলি,
» বাচ্চারা বারবার ফোন দিচ্ছে বুঝি?
ম্লান হাসি ফুটিয়ে বললেন,
» আমি নিঃসন্তান। আমার ভাই বোনদের সবকটি বাচ্চারা আমাকে মা ডাকে। খুব ভালোওবাসে।
এরপর একটু একটু করে কখন যেন একে অপরের সুখ দুঃখগুলি ভাগাভাগি করেছি দুজনে অনেকটা অজান্তেই। উনি পরমাত্মীয়ের মতো কাছের মানুষ হয়ে বলে চলেন নিজের কথা। মিষ্টি চেহারাটা কখনো উচ্ছলতায় ভরে ওঠে, কখনো বিষাদে বিষণ্ণ হয়। জল টলমল করে সুন্দর চোখ দুটি। অকপটে বলে চলেন সুখ দুঃখের বার্তা।
রাজশাহী থেকে আমার হাজবেন্ডের ফোন আসে। ঢাকা থেকে আমাদের সবার বড় আপা এবং ভাই দুপুরের ফ্লাইটে সৈয়দপুর হয়ে দিনাজপুর পৌঁছুলেন এইমাত্র। আমার বাবার বড় আদরের ভাগ্নী ভাগ্নে।
‘বুকটা কেঁপে ওঠে। কেন? হঠাৎ?’
একটু পরে ছোট ভাইয়ের ফোন। স্টপেজের আগেরটায় অপেক্ষা করছে। ওখানে নামতে বলে।
এবার সহযাত্রীর হাত চেপে ধরি আমি।
বলি,
» আপা আমার খুব ভয় করছে।
সব সান্ত্বনা কণ্ঠে ঢেলে আশ্বস্ত করেন।
বলেন,
» আপনার স্টপেজের পর আমার স্টপেজ। অসুবিধা নেই, আমি আপনার সাথেই নেমে যাব। হাতটা ধরেন পরম মমতায়। ঘাবড়াবেন না আপা। নামবার আগে আমার ফোন নাম্বারও তুলে নেন।
আমি শত চেষ্টাতেও স্বাভাবিক হতে পারি না। অজানা আশঙ্কায় আর তার সান্ত্বনার আশ্বাসে দুহাতে সময় ঠেলে চলি।
নির্ধারিত স্টপেজে নামি দুজনে। লকারে লাগেজ চিহ্নিত করি সহযাত্রীর সাথে। অদূরে অপেক্ষমাণ আমার একমাত্র ভাই। এগিয়ে আসতেই জিজ্ঞেস করি…
» আব্বা কেমন এখন?
শুকনো মুখে জবাব দেয় ভাই…
» ভালো নেই আব্বা, ভালো নেই।
মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে। আর কিচ্ছু মনে থাকে না। সারাটা পথের মঙ্গলাকাঙ্ক্ষী সহযাত্রীর কথা বেমালুম ভুলে যাই। এক ছুটে হাজির হই ভাইকে অনুসরণ করে পথের বিপরীত পাশে ‘জিয়া হার্ট ফাউন্ডেশন’। সহযাত্রীকে ‘আসি’ বলবার মতো সৌজন্যতাটুকুও নয়।
আই সি ইউর টানা বারান্দায় আমার নিষ্ফল প্রার্থনা বিলাপ আর স্বজনদের সমব্যথার মাঝে অচেনা নাম্বার থেকে ফোন এলো।
» আপা আপনার আব্বা কেমন আছেন?
» কে?
» আমি আপনার সহযাত্রী। একটু আগেই বি আর টি সি তে এলাম পাশাপাশি।
অন্তর ছুঁয়ে গেল এই কঠিন সময়ে সহযাত্রীর আন্তরিকতায়। কান্নাগুলো ঠেলে এলো আবেগতাড়িত হয়ে। বললাম…
» আমার আব্বা ভালো নেই আপা, গত রাত থেকে লাইফ সাপোর্টে আছেন।
» আপা ভেঙে পড়বেন না। কাঁদবেন না আপা। চিকিৎসা চলছে তো, ভালো হয়ে যাবেন। দোয়া করেন, শুধু দোয়া।
এভাবে প্রতিদিন প্রতিবেলা খবর নিতেন, সাহস দিতেন। বলতেন- ‘দোয়া পড়বেন আর পানির বোতল রাখবেন, পানি খাবেন ঢোকে ঢোকে অবশ্যই।’
চার দিন পর নতুন দিনের আলো ফুটবার আগেই সব শেষ। আমার পথ চলার প্রদীপ, বিশাল বৃক্ষছায়া, ভালোবাসার অবলম্বন আমার বাবা আর নেই।
ভেঙে চুরে যাওয়া দুঃসময়ে নিমজ্জিত আমি ফোন ধরতে অপারগ হই। কখনো ইচ্ছায়, কখনো অনিচ্ছায়। অবশেষে আবারও একদিন কথা হয়।
» আপা আমি চলে যাচ্ছি। হাজবেন্ড এসেছেন। রংপুর হয়ে রাজশাহী ফিরবো। ভালো থাকবেন।
» আপনিও ভালো থাকবেন।
শোকের সাগরে উত্তাল হয় অনাকাঙ্ক্ষিত কষ্টগুলো। সহযাত্রীকে মনে পড়ে। ফোন করতে গিয়ে খেয়াল হয় নাম্বার তো সেভ করা হয়নি। অনেক মিসকল রিসিভ কলের ভিড়ে খেই হারিয়ে ভাসতি উষসীকে ডাকি। বলি,
» কদিন আগের বারবার করা নাম্বারটা খুঁজে সেভ করে দাও।
বহুবার মিস কল হয়ে থাকা এক নাম্বার খুঁজে পায় উষসী। বলে…
» কি নামে সেভ করবো ফুপুজি?
» নাম তো জানি না। বিআর টি সি আপাই লিখো।
সময় গড়ায়। ফিরি আপন ঘরে। অন্তঃসারশূন্য হৃদয়ে কষ্টের আছড়ে পড়া ঢেউগুলোতে স্মৃতির অতলে তলিয়ে হাতড়ে বেড়াই আব্বাময় দিনগুলো।
মনে পড়ে দুঃসময়ের বন্ধুটিকে। কল লিস্টে বি আর টি সি আপার নামে কল দেই। ওপাশ থেকে ভেসে আসে নারী কণ্ঠ।
» হ্যালো…
» কে বলছেন? কাকে চাইছেন?
আমি আমতা আমতা করি। এলোমেলোভাবে বোঝাতে চেষ্টা করি পঁচিশে এপ্রিল বি আর টি সি বাসযাত্রায় সহমর্মিতা আর সমব্যথীর জন্য কৃতজ্ঞতা চিত্ত স্মরণ করছি সেই সহযাত্রীকে। তিনি সেই কিনা।
ওপ্রান্তের কণ্ঠটা এবার বিস্ময়ের ঘোর ঝেড়ে ফেলে বলে…
» আপনি কি রিয়া আন্টি?
আমি চমকে উঠি,
» হ্যাঁ.. হ্যাঁ.. কিন্তু আপনি?
কণ্ঠে ভালোবাসার উষ্ণতা ঢেলে বলে ওঠে…
» আমি ইয়াসমিন, আপনার সামনের বাড়ির প্রতিবেশী। কিন্তু আপনার সহযাত্রীর সাথে আমার নাম্বারটা গড়বড় হলো কিভাবে ভাবছি।
ভূপতিত হই আমি,
» ইয়াসমিন? তুমি? কিন্তু…
খোলাসা হলো ব্যাপারটা পরে। আমার দুঃসময়ে প্রিয় মানুষগুলো আমার দুঃখগুলো শেয়ার করেছে, করতে চেয়েছে। ইয়াসমিনও বারবার কল দিয়েছে, আমি মিস করেছি পরিস্থিতির অপারগতায় হয়তোবা।
এক দুই করে দিন মাস গড়ায়।
ক্ষণিকের সঙ্গী, দুঃসময়ের বন্ধু, কষ্টের সাথী এবং ভবিষ্যতের উদ্ভূত পরিস্থিতির দিকনির্দেশনা তাঁর অভিজ্ঞতার আলোকে সেদিন অগোচরেই আলাপচারিতায় এসেছিল, ভেবে বিস্মিত হই। বিভিন্ন সময়ে ঋণ অনুভব করি আমি তাঁর। যে ঋণ শোধরাবার সাধ্য আমার নেই। শুধু সাধ খুঁজে পাবার।
কিন্তু কোথায় কিভাবে পাব আমার কাঙ্ক্ষিত বিআর টি সি আপাকে???
রচনাকাল: ১৪-০৯-২০১৯ইং।
মন্তব্য করুন