প্রথম কলি
[কৈফিয়ত: ‘রমণীর রত্ন’ -এই উপন্যাসটি ‘আনন্দ’ নামের এক এতিম ছেলেকে ঘিরে। তার ফেলে আসা জীবনের কিছু সত্য ঘটনা এবং চলমান জীবনের কিছু কল্পনা মিশিয়ে উপন্যাসটি লেখা হয়েছে। এখানে তার জীবনের বিস্তারিত আলাপ-আলোচনা তুলে ধরার চেষ্টা করেছি। তাই সকলের কাছে বিনীত অনুরোধ- উপন্যাসটির শেষ অধ্যায়গুলো পর্যন্ত মনোযোগ সহকারে পড়বেন।]
[এক]
বহুমুখী স্বপ্নে ঘেরা একটি শহর। সেই শহরটির নাম হলো ‘মমতা’। এই একটি শহরের মাঝেই কোনো একটি কোণায় পড়ে আছে সুন্দর একটি গ্রাম। গ্রামটিও ছিল যথেষ্ট শান্তশিষ্ট পরিবেশের। সেই গ্রামের নামটিও ছিল ‘মায়াবিনী’।
মমতা ও মায়াবিনী এই দুটি শহর ও গ্রামের মাঝেই সুখ আর দুঃখে সাজানো ছিল ছোট্ট একটি পাড়া। পাড়াটিও ছিল অপূর্ব স্মৃতিচিহ্নে আঁকা। পূর্বপুরুষেরা বড়সড় একটি ঐক্য বৈঠক সিদ্ধান্তের মাধ্যমে সেই পাড়াটির নামটি রেখেছিলেন ‘মায়া’।
সেই পাড়ার অল্প কিছু সংখ্যক লোকজন ছিল বেশ বুদ্ধিমান এবং খুব ভদ্রোচিত। তবে কিছু লোকও ছিলেন সমাজের বাইরে লিপ্ত। তবুও কোনো কোনো সময় সবাই মিলে তাঁরা প্রকাশ্যে গোপনে একে অপরের সাথে ঝগড়াঝাঁটি ও অন্যান্য কিছু বিশৃঙ্খল ধরনের কাণ্ড ঘটে থাকলেও কিছুদিন যেতে না যেতেই পরে অমনি তাঁরা সেই আগের মতো একই শান্ত পরিবেশে মিলেমিশে থাকতেন।
তুলনামূলকভাবে সেক্ষেত্রে এটিও বলা যেতে পারে যে কারও হাতের পাঁচটি আঙুল কখনও সমান নয়। নিশ্চয়ই সবারই হাতের আঙুলগুলো ছোট বড় তো থাকেই? সেই সূত্রে এ শহর ও গ্রামের একটি পাড়ায় বসবাসরত বহুগুলো মানুষের মধ্যে এ ধরনের কয়েকজন লোক সমাজে থাকবে না যে সেও কিন্তু কল্পনার বিষয় নয়! থাকতেই পারে।
যাই হোক, তবুও তাঁরা বেলা শেষে একসঙ্গে একক সমাজে সবাই যথেষ্ট শান্তশিষ্ট ভাবেই মিলেমিশে থেকেছিল।
পাড়াটি এমনি এক নীরবে নিস্তব্ধে ঘুমিয়ে থাকতো যেমনটি ধরে নেওয়া যায়, কোনো একটি তালাবন্দি সোনার বাক্সের মতোই। এই পাড়াটিতে সুন্দর স্বভাবের একজনই মাত্র এতিম ছেলে ছিল। বাবা মা তাঁহাদের মৃত্যুর পূর্বে আদর স্নেহে তাঁরা ছেলেটির নামটি রেখে গিয়েছিলেন ‘আনন্দ’।
[দুই]
কোনো একদিন ‘আনন্দ’রই মুখ থেকে শোনা হয়েছিল-
তাঁর জন্মস্থান ছিল এই শহরেরই আশেপাশে থাকা অন্য একটি শহরের কোনো একটি গ্রামে। খুব দুঃখজনক বিষয় হলো যখন তাঁর বয়স মাত্র পাঁচ কিংবা সাত বছর তখন তাঁর আদরিণী মা ‘আনন্দকে’ একা রেখে এই দুনিয়াটি থেকে তিনি তাঁর শেষ নিঃশ্বাসটুকু ত্যাগ করেছিলেন! মায়ের মৃত্যুর পর পরই অনেক কষ্টেই দিনের পর রাত ‘আনন্দের’ বাবা ‘আনন্দ’কে আদর স্নেহে বড় করতে শুরু করেছিলেন। প্রায় সময়ই সান্ত্বনার মাধ্যমে ‘আনন্দের’ বাবা ‘আনন্দ’কে ওঁর মা হারানোর অভাবটা আড়াল করে রেখে দিয়েছিলেন।
এবং সবসময় ওঁর মায়ের স্মৃতিগুলোকে ভোলানোর জন্য যথেষ্ট চেষ্টাটিও করতেন- যেন কখনো মা হারানোর শোকের ছায়াটি ‘আনন্দের’ মস্তিষ্কে এসে ভর না করে। এমনকি ওঁর মা কখন কীভাবে এই পৃথিবী থেকে চিরবিদায় নিয়েছিলেন সেটিও কোনো সময়ের জন্য ভুল করে হলেও সেই করুণ গল্পটি তিনি তাঁকে বলতেন না এবং কখনো স্মরণও করিয়ে দিতেন না।
এতটা যত্নের পরেও মাঝেমধ্যে ‘আনন্দ’ তাঁর মা’কে মনেমনে ভীষণ অনুভব করতো! অনেক সময় মনেমনে এটাও ভাবতো যে, তাঁর মা এই দুনিয়াতেই তিনি আর বেঁচে নেই! এমতাবস্থায় বেশকিছু বছর যাবৎ পর আনন্দের বাবা তিনিও একদিন হঠাৎ ‘আনন্দ’কে ছেড়ে চলে গেলেন পরপারে। পূর্ব থেকেই তিনি একটি চর্মজনিত কঠিন রোগে আক্রান্ত হয়ে দীর্ঘদিন ধরে কষ্ট যন্ত্রণায় ভুগছিলেন। বাবার মৃত্যুর শোকের যন্ত্রণাটা ‘আনন্দ’ কিছুতেই সে সহ্য করতে পারছিল না!
বাবার মৃত্যুতে ‘আনন্দ’ খুব বেশিই ভেঙে পড়লো! বাবার মৃত্যুর পর পরই ‘আনন্দ’ হয়ে গেল শয়নহারা ও সারাক্ষণ সে শুধু ক্রন্দনরত একজন বড় অসহায়! এই দুনিয়ায় এখন সে অধীর নীরবতার এক দুঃখী এতিম ছেলে।
বাবার মৃত্যুর কিছুদিন পরেই গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিগণ সকলের অনুরোধে আনন্দের চাচা আনন্দকে তাঁর নিজ দায়িত্বে লালন পালন করার দায়িত্বটা হাতে নিয়ে নিলেন। সেই থেকেই ‘আনন্দ’কে তাঁর বাবা মায়ের মতোই তিনি তাঁকে আদর যত্নটি করতেন।
তবুও বাবা মায়ের মতো ততটা আদর যত্ন ‘আনন্দ’ তাঁর চাচা ও চাচীর কাছ থেকে মোটেও পেতো না! সেভাবে আদর যত্ন করুক বা না করুক ‘আনন্দের’ পড়ালেখার ক্ষেত্রে ওঁনারা অনেকটাই ওঁকে যথেষ্ট পরিমাণ সাহায্য সহযোগিতা করে থাকতেন। আর ওভাবেই ‘আনন্দ’ পদে পদে চলতে শুরু করেছিল জীবনমুখী নানা স্বপ্নের ধারাবাহিকতায়! ‘আনন্দের’ চেহারাটা দেখতে বেশ সুন্দর। উঁচু লম্বাতেও মোটামুটি অনেকটাই ছিল। যেমনি দেখতে তাঁকে উচ্চতা অধিক তেমনি ছিল খুব শান্তশিষ্ট ও ভদ্র। পড়ালেখাতেও ছিল সে দক্ষ পারদর্শী।
এমতাবস্থায় ‘আনন্দ’ পড়ালেখার মধ্যে থেকেও তাঁর চাচা চাচীর বিভিন্ন ধরনের কাজকর্মগুলোও সে নিজের মনে করেই নিঃস্বার্থভাবে করে থাকতো। সেই থেকে চাচা ও চাচী আনন্দকে এতটাই বেশি ভালোবাসতে শুরু করেছিলেন যেন তার অনুপাতে ‘আনন্দ’ তাঁর অতীত হারানোর কিছুটা কষ্ট ভুলে থেকেছিল।
ও, আপনাদের তো একটি কথা বলাই হয়নি! এর বছর কয়েক পূর্বে ‘আনন্দ’ যখন পঞ্চম শ্রেণিতে লেখাপড়া করছিল সে তখন ঐ সময় পঞ্চম শ্রেণির বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফলে উত্তীর্ণ হয়েছিল। তখনকার সেই সময়ে ‘আনন্দের’ বৃত্তির ভালো ফলাফলটি ভীষণ খুশিতে বাবাকে জানাতে তাঁর নিকট গিয়েছিল, কিন্তু দুঃখজনক হলেও ঐ দিনই বৃত্তির ফলাফলটি শুনতে পেয়ে ওঁর বাবা কিছুক্ষণ পরই তাঁহার শেষ নিঃশ্বাসটি ত্যাগ করেছিলেন!
যাই হোক এরপর থেকে ওঁকে ওঁর চাচা ও চাচীরাই লেখাপড়ার যাবতীয় খরচ ও অন্যান্য সমস্যাগুলোর বিষয়ে দৃষ্টি রাখতেন। এছাড়াও নিজের সন্তানটির মতো ভেবেই তাঁরা তাঁদের সেই দায়িত্বটিও ন্যায়নীতি মোতাবেক সুন্দর চিন্তাভাবনায় যথেষ্ট পালন করতেন। যখন ‘আনন্দ’ সে অষ্টম শ্রেণিতে পড়াশুনা করছিল- তখনও ঐ একই বৃত্তি পরীক্ষাটি দেবার জন্য অষ্টম শ্রেণিতেও সে প্রস্তুতি নিয়েছিল।
কিছুদিন পরে বৃত্তি পরীক্ষা দেওয়া সমাপ্তি হয়ে গেলে তার দেড় মাস পরই অনুরূপ ওঁর ভালো ফলাফলটি সঙ্গে নিয়ে চাচার কাছে এসে হাজির হয়েছিল।
চাচা তাঁর সেই খুশির সংবাদটি শুনতে পেয়ে তিনিও ঐ দিন অফুরন্ত খুশিতে উন্মত্ত হয়ে পড়েছিলেন। এতটাই তিনি খুশি হয়েছিলেন যে তাহা বলতে গেলেও এখানে তা লিখে শেষ করা যাবে না। ঐ দিন চাচা কোনো একজন লোকের দ্বারা সমস্ত পাড়ায় বিভিন্ন লোকজনদের ঢোল পিটিয়ে বাড়ির উঠোনে ডেকে নিয়েছিলেন। এবং ভালো একটা শুভ দিন তারিখ ঠিকঠাক করে সবাইকে দাওয়াতের বিষয়টি জানিয়ে দিলেন যেন ‘আনন্দকে’ ঐ দিন তাঁরা সকলেই এসে দোয়া ও আশীর্বাদ করে যান।
আর সেটিও করেছিলেন একমাত্র এই সুনামধন্য প্রিয় ভাতিজা ‘আনন্দের’ বৃত্তি পরীক্ষার ভালো ফলাফলটির জন্য। এরপর থেকে ‘আনন্দ’ পড়ালেখায় আরও গভীর মনোযোগী হয়ে উঠলো, সবসময়ের জন্য সে নিজেকে খুব ব্যস্ত রাখতো। ‘আনন্দ’ এমন কোনো ধরনের খেলাধুলোতেও তেমন একটা মনোভাব নিয়ে ততটা সময় অপচয় করতো না।
[তিন]
সেদিন ছিল ঘনকালো গভীর কুয়াশার রাত। রাতটা তখন আনুমানিক হবে প্রায় নয়টা কয়েক মিনিটের মতো। ও হ্যাঁ আর একটা কথা তো বলতে ভুলেই গিয়েছিলাম! ‘আনন্দ’ শুধু পড়ালেখা নিয়েই ব্যস্ত ছিল না বরং সে পাঁচ ওয়াক্ত নামাজের প্রতিও অধিক মনোযোগী ছিল। যাই হোক ঐ দিন সে এশার নামাজ আদায় করে হালকা পাতলা কিছু খাবার খেয়ে নিয়ে তাঁর শয়ন ঘরে প্রবেশ করছিল।
ঘরে ঢুকতেই তাঁর নিজের মুখের নিচের ঠোঁটটি দুই দাঁতের মাঝে আলতোভাবে চেপে ধরে আনমনে সে বলতে লাগলো-
“এই দ্যাখ তো আজ আর আমি কুপিটিও জ্বালিয়ে রাখতে ভুলে গেছি, আমাকে দিয়ে আর কিচ্ছু হবে না, শুধু আমার খাওয়া দাওয়া আর আড্ডা, এছাড়া অন্য কিছুই করতে পারি না!”
আরও অহেতুক নানান কিছু ইত্যাদি ইত্যাদি কথাবার্তা নিজের মনটির সাথেই সে বিড়বিড় করছিল। তবে তাঁর সেই কথাগুলো ছিল পুরোটাই ভুল ধারণার। সে মোটেও তেমনটি নয়, আর অতটা ভুলে থাকার মনমানসিকতার ছেলেটিও নয় সে। কোনো একটি অতিরিক্ত কাজের জন্যই তাঁর আজ বাড়িতে ফিরতে দেরি হয়েছিল, তাই হয়তো ঘরের কুপিটা জ্বালানোর সময়টিও ছিল না তাঁর।
অন্ধকার ঘরে প্রবেশ করেই বালিশের নিচ থেকে দিয়াশলাইটি হাতে নিয়ে সে কুপিটা জ্বালিয়ে দিলো। তখনই ‘আনন্দের’ মনে হয়েছিল যেন তাঁর জীবনের অন্ধকারগুলো আরও কতই না ভয়ানক হতে পারে। এরপর সে চৌকোণা তাঁর একটি ছোট্ট টেবিল থেকে হাত বাড়িয়ে একটা বই নিয়ে নিলো। পরে পড়ার বইটি কুপির সামনে ও টেবিলের উপর রেখে নিজের বিছানার উপর বসে ধীরে ধীরে পড়তে লাগলো।
রাত কতটা বেজেছিল সেই খেয়ালটিও তাঁর ধ্যানে একদম ছিল না। কোনো কোনো রাতে সে পড়তে পড়তে টেবিলের উপরই মাথা ঠুকিয়ে ঘুমিয়ে পড়েছিল। আবার কোনো কোনো রাতে পড়ার অধীর মগ্নতায় ফজরের আজানটিও সে শুনতে পেতো। কিন্তু যখন সে আজানের ধ্বনি শুনতে পেতো ঠিক তখনই তাঁর হাতের বইটি আস্তে বন্ধ করে সোজা মসজিদের পথে রওনা দিতো। মসজিদ থেকে ফজরের নামাজ শেষ করে ফিরে এসে ‘আনন্দের’ আর পড়তে বসা হতো না। সেই সময়ে শরীরের ক্লান্তি অনুভবে সে ঘণ্টা তিনেক দীর্ঘ একটা আরামের ঘুম দিতো।
ঘুম থেকে উঠেই সে দাঁত মাজতে মাজতে ঘাড়ে একটা লাল গামছা ঝুলিয়ে সোজা পুকুরের ঘাটে গিয়ে গা-গোসল সেরে নিতো। এরপরে স্কুলে যাবার জন্য সে সেজেগুজে নিজেকে খুব দ্রুত সাজিয়ে তৈরি করে নিতো। এর পর পরই ঐ সময়ে ওঁর চাচী ডাকাডাকি শুরু করে দিতেন ওঁর সকালের নাস্তা ভাত খাবারের জন্য। ‘আনন্দ’ একগালে ভাত খেতো আর অন্য গালে নানান রসের কথায় চাচীর সঙ্গে হাসিঠাট্টায় গল্প গুজব করতো। অমনি চাচীও আদর করে বকে দিয়ে বলতেন-
“খেয়ে নে তো আগে, তারপর না হয় যত তোর কথা আছে বলিস,”
“হ্যাঁ গো- আমার কপালে কী আর খাবারের পর আবার অবসর সময় জোটে যে তোমার সাথে বসে বসে সারাক্ষণ গল্প করবো? স্কুল তো আর নেই আমার! স্কুলে কী যেতেও হয় না আমার?”
“তাহলে এত বকর বকর করছিস কেন? তাড়াতাড়ি খেয়ে নিয়ে এবার স্কুলে চলে যা।”
সত্যিই যেন ‘আনন্দ’ আজ তাঁর মা বাবাকে হারিয়ে কারও সঙ্গে একটু মন খুলে কথাও বলতে পারে না। সবসময়ের জন্য তাঁকে যেন তাড়া করতো নানা ধরনের ব্যস্ততায়। এরপরেও স্কুলে গিয়ে তাঁর শিক্ষকদের বিভিন্ন ধরনের আদেশ ও উপদেশগুলোও মেনে চলতে হতো। পাড়া মহল্লার কোনো একটি ব্যক্তি জানতে বা বুঝতেও চায়নি আসলে তাঁর জীবনের সময়গুলো কেমনে কীভাবে কাটছে! কী ভাবেই বা তাঁর দিনগুলি গত হচ্ছে! শুধু সে নিজের কষ্টটা নিজেই বহন করে চলতো! এরপরেও ‘আনন্দ’ পাড়া প্রতিবেশী ও স্কুলের শিক্ষকদের এতটুকুও বুঝতে দেয়নি যে ওঁর বুকের ভিতরে কতটা যন্ত্রণা লুকিয়ে আছে! যন্ত্রণা যতটাই থাকুক না কেন এরপরেও প্রতিটা মুহূর্তে ‘আনন্দ’ হাসিমুখেই থাকতো। ওঁর মায়াবী মুখটি দেখে অনেকে অযথা কোনো প্রয়োজন ছাড়াই ওঁর দিকে তাকিয়ে মুচকি হাসি দিয়ে বলতো-
“কেমন আছ আনন্দ?”
তবে এই যে একটিমাত্র বাক্য এটি শুনতে পেলেই ‘আনন্দ’ ভীষণ খুশি হয়ে যেতো। এভাবেই দিনের পর দিন চলতো তাঁর প্রতিটি সৎ-সাহসী কর্ম ও পড়ালেখার অসীম চিন্তাভাবনাগুলোর মধ্য দিয়ে। ‘আনন্দ’ প্রায় সময়ই সবার সাথে মিলেমিশে থাকার বিষয়টিও বিশাল বড় একটি রুটিন মনে করতো। হঠাৎ একদিন জোহর নামাজের পর তাঁর চাচা কোনো একটি লোককে পাঠালেন ‘আনন্দকে’ তাঁহার নিকট ডেকে নিয়ে আসার জন্য।
[চার]
সময়টা ঠিক ছিল তখন হয়তোবা দুপুর ১টা ৫০ মিনিটের অধিক। ঐ সময় মোটেও কোথাও ‘আনন্দকে’ খুঁজে পাওয়া যাচ্ছিল না। হয়তো আনন্দ জোহরের নামাজ আদায় করে অন্য কোথাও কোনো কাজের উদ্দেশ্যে চলে গেছে। এতটা দুশ্চিন্তা করবারও প্রয়োজন ছিল না, তাছাড়া তো ‘আনন্দ’ অবুঝ ছোট কোনো বাচ্চাটিও নয় যে সে পথ ভুলে কোথাও হারিয়ে যাবে! এদিকে চাচার পাঠানো লোকটি অনেক খোঁজাখুঁজির পরেও ‘আনন্দকে’ কোনো ক্রমেই খুঁজে পেলেন না। লোকটি যখন ক্লান্ত হয়ে ফিরে আসছিলেন, আনন্দের চাচা দেখলেন লোকটির সাথে আনন্দ ছিল না। ‘আনন্দের’ চাচার নিকট লোকটি একা ফিরে এসে বললেন-
“আনন্দকে কোথাও খুঁজে পেলাম না! অনেক খোঁজাখুঁজি করে দেখেছি কিন্তু কোনো লাভ হলো না, বিভিন্ন লোকজনদেরকেও জিজ্ঞেস করেছিলাম অথচ কেউই ওঁর কথা বলতে পারছেন না! তবে কিছু লোকজন আমাকে এটাই বলছিলেন যে, হয়তো আনন্দ কোথাও আড্ডা দিতে গিয়েছে।”
চাচা লোকটির মুখে এ কথাটি শুনতে পেয়ে তাঁর উপর ভয়ানক রেগে গিয়ে বললেন-
“এই যে শুনুন, আমার আনন্দ এমন কোথাও আড্ডা দেবার মতো ছেলেটিও নয়? আজকের পর থেকে আপনাকে সাবধান করে দিচ্ছি খবরদার আমার ‘আনন্দকে’ নিয়ে যেন এই ধরনের কথা আর কখনো কোনো দিন আপনার মুখে শুনতে না পাই আমি?”
লোকটি মিনতির স্বরে বললেন-
“আমার ভুল হয়ে গেছে আজ্ঞে আমাকে ক্ষমা করে দিবেন!”
সন্ধ্যা হবার আরও কিছুক্ষণ সময় বাকি ছিল। এরই মধ্যে আনন্দ মাগরিবের নামাজ আদায় করার জন্য গ্রামের মসজিদে এসে উপস্থিত হলো। কিছুক্ষণ পর মসজিদে তাঁর চাচাও এসে উপস্থিত হলেন। চাচা মসজিদের ভিতরে প্রবেশ করেই দেখতে পেলেন ‘আনন্দ’ মসজিদে বসে তসবি জপছিল। ‘আনন্দকে’ দেখার পর চাচা অনেকটাই দুশ্চিন্তা থেকে মুক্তি পেলেন। এরপর চাচাও ‘আনন্দের’ পাশে গিয়ে বসলেন। চাচা ‘আনন্দকে’ মধ্যম কণ্ঠে বললেন-
“নামাজ শেষ করে কোথাও যেন যেও না ঠিক আছে বাবা, কিছু কথা আছে তোমার সাথে।”
‘আনন্দ’ তাঁর চাচার মুখের দিকে তাকিয়ে একটু মুচকি হেসে সে বলল-
“আচ্ছা, ঠিক আছে”
এরপরে একসঙ্গে সবাই মিলে ভরা জামাতে নামাজ আদায় করে নিলেন। নামাজ সমাপ্তি করে পরে মসজিদ থেকে লোকজনেরা সবাই দল বেঁধে বাহির হচ্ছিল। ‘আনন্দ’ দীর্ঘ সময় মসজিদের বাইরে দাঁড়িয়ে তাঁর চাচার জন্য অপেক্ষা করছিল। সে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাবছিল তাঁর চাচা কখন মসজিদ থেকে বাহির হবেন ও পরে একসাথে বাড়িতে চলে যাবে।
চাচার বয়সটা এখন মোটামুটি সত্তরের মতো চলছে। এর ফলে তাঁকে নামাজ আদায় করতেও সময় একটু বেশিই লেগে যেতো। একটু পরই চাচা মসজিদ থেকে বাহির হলেন। উনি এসেই চাচা ও ভাতিজা মিলে দু’জনই একসাথে পথ চলতে লাগলেন। ‘আনন্দের’ বাড়ি থেকে মসজিদের উদ্দেশ্যে পায়ে হেঁটে যেতে সময় লাগতো প্রায় ১৫ মিনিটের মতো এবং ফিরতেও সেই একই সময় লেগে থাকতো। কিন্তু আজ হয়তো ‘আনন্দের’ সঙ্গে তাঁর চাচা আছেন বিধায় দুই চার মিনিট সময় আরও বেশিই লাগতে পারে! চাচা ভাতিজা মিলে ধীরে ধীরে চুপচাপ পথ চলছিল। মাঝপথেই চাচা ‘আনন্দকে’ প্রশ্ন করলেন-
“আনন্দ’ আজ সারাটি দিন তুমি কোথায় ছিলে বাবা?”
‘আনন্দ’ তাঁর চাচার প্রশ্নের জবাবে বলল-
“চাচা আমার স্কুল থেকে ছয়মাস পূর্তি যে বৃত্তির ভাতাটি দেওয়া হতো, সেই ভাতার টাকাটি আমি গতকাল পেয়েছিলাম। আর সেই ভাতার টাকাটা আমি চাচীর হাতেও দেইনি, সেই টাকাটা নিয়েই আমি বাজারে গিয়েছিলাম। এবং সেটা দ্বারা আপনার জন্য আমি কয়েক গজ পাঞ্জাবির কাপড় কিনে সেটি ওখানকারই একজন দর্জিকে সেলাই করতে দিয়ে এসেছি, তাই ফিরতে আমার এতটা দেরি হয়েছে!”
চাচা ‘আনন্দের’ মুখে এসব কথাগুলো শোনার পর তিনি ‘আনন্দের’ সহিত স্নেহ ভরা রাগ নিয়ে অনেকক্ষণ বকাবকি করলেন। এবং তিনি এটিও বললেন-
“আমাকে না জানিয়ে কেন তুমি এটা করতে গেলে?”
আনন্দ বলল-
“আগামী পরশু তো পবিত্র ঈদের দিন, তাই আর কী ভেবেছিলাম আপনি তো গত ঈদেও নতুন কোনো কাপড় পরিধান করেননি! অথচ চাচীর ও আমার জন্য কিনে এনেছিলেন। কই তখন তো আমরা আপনাকে এভাবে আপনার মতো করে উল্টো পাল্টা প্রশ্নটিও করিনি? সেদিন কী আমরা এই প্রশ্নটি করেছিলাম যে, আপনার জন্য কেন কিনে আনা হয়নি? নাকি করেছিলাম? বলুন?”
চাচা তখন একটু মিষ্টি হাসি দিয়ে বললেন-
“পাগল তোমাকে তো আজ দুপুর থেকেই আমি অনেক খোঁজাখুঁজি করেছিলাম, ভেবেছিলাম আমি আর তুমি দুজন মিলে একসাথে বাজারে যাবো কিছু কেনাকাটি করার জন্যই। আচ্ছা যাই হোক আমার পাঞ্জাবির কাপড়টি কিনেছো যখন তা অবশ্য এক হিসাবে তুমি ভালোই করেছো, কেননা আমি যদি পাঞ্জাবিটি বাজারের রেডিমেড দোকান থেকে কিনতেও যেতাম তবে হয়তো দোকানদার সেটার দাম ধরে বসে থাকতো অনেক। তাছাড়া সেই দাম দিয়েই যদি আমি কিনে নিতাম তবে সেটি বেশিদিন টিকতোও না বরং খুব তাড়াতাড়ি ছিঁড়েও যেতো। ও হ্যাঁ এখন বেশি সময় নেই আগামীকাল তৈরি থেকো অন্যান্য আরও কিছু বাজার আছে তা করতে হবে! অন্য কোথাও যেন যাওয়া হয় না, ঠিক আছে?”
‘আনন্দ’ চাচার কথাটির জবাবে বলল-
“আচ্ছা- ঠিক আছে।”
এদিকে চাচীও বাড়ির সামনে ‘আনন্দের’ ফেরার অপেক্ষায় দৈত্যের মতো দাঁড়িয়ে আছেন। ‘আনন্দকে’ দেখার পর মনে হয়েছিল যেন তাঁহার হারিয়ে যাওয়া মানিক রত্নটি ফিরে পেলেন। তিনিও ভাঙা ভাঙা গলায় বলতে শুরু করলেন-
“কই ছিলি রে আজ সারাদিন? দেওয়ানী কোথাকার;”
ইত্যাদি ইত্যাদি ভাষায় বিভিন্ন ধরনের কিছু কথায় ‘আনন্দকে’ বকতে লাগলেন। আনন্দের চাচা আনন্দের চাচীর উপর রেগে গিয়ে বললেন-
“এই তো তুমিও শুরু করলে? ছেলেটি সারাদিন আজ কী খেলো না খেলো সে কথাটি জিজ্ঞেস না করে- অথচ তাঁকে তুমি নানান ভাষায় বকছো?”
আর ওমনি চাচী তাঁর চাচার রাগের ভয়ানক পরিস্থিতিটা দেখতে পেয়ে শান্ত হয়ে গেলেন ও পরে ‘আনন্দকে’ বললেন-
“তাই তো, আয় তো বাবা, আগে খাবি আয় তো।”
আনন্দের ঘাড়ের উপর হাতটা রেখে চাচী ওঁকে নিয়ে রান্না ঘরে চলে গেলেন। তাড়াতাড়ি করে একটা থালা ও একটি গ্লাস আনন্দের সামনে দিয়ে পাতিল থেকে একটি গামলা/বোলে করে তিনি ভাত বাড়ছিলেন। ভাত বাড়া শেষ হলেই আবারও তিনি বললেন-
“ক্যারে- তুই তো এখন আর অত ছোটও নস? অনেক বড়ই তো হয়েছিস, এখনও কী তোর হাতটা আমাকেই ধুয়ে দিতে হবে বল তো?”
উত্তরে ‘আনন্দ’ অভিমান করে বলল-
“এই তো শুরু করে দিলে? তাহলে আর কী- তোমার খাবার তুমিই খাও, আমি গেলাম, পড়তে হবে আমায়।”
‘আনন্দের’ অভিমানের কথাটি চাচী শুনতেই দ্রুত ওঁর হাতটি টেনে নিয়ে ধুয়ে দিয়ে দিলেন। চাচী আনন্দের হাতে পানি ঢালছেন আর বলছেন-
“হুম ছোট্ট খোকা তো, এখনও অভ্যাসটা দূর হলো না, এখন খেয়ে নে, আর আমাকে একটু শান্তিও দে, তুই কী জানিস না যে, তুই না খেয়ে থাকলে খুব খারাপ লাগে আমার? তোকে ছেড়ে কী আমি কোনোদিন কোনো রাতে নিজে আগে কখনো খেয়েছিলাম? আমার কি তোর মতো ক্ষুধা লাগে না বোধহয়?”
“তাহলে এবার তুমিও এসে আমার সাথে খাও, বকবক করো না তো চুপ করো এখন!”
খাবার শেষ করেই ফের আনন্দের রুটিন শুরু হয়ে গেল পড়ালেখার।
রচনাকাল: ০৭-০২-২০১৯ইং।
মন্তব্য করুন