আমরা ফেলে এসেছিলাম আমাদের সবকিছু।
ফেলে এসেছিলাম পাহাড়ের ঢালে ঢালে ছড়িয়ে থাকা ঘর,
বাঁশঝাড়ের ফাঁকে দুপুরের রোদ,
শুভলংয়ের জলের মতো স্বচ্ছ দিন,
কাচালংয়ের উর্বর বুক,
মাইনীর পাড়ে ধান শুকোনোর উঠোন,
কর্ণফুলীর স্রোতে ভেসে যাওয়া শৈশব।
ফেলে এসেছিলাম শুধু মাটি নয়,
আমাদের পূর্বপুরুষদের হাড়,
আমাদের দেবতার পাহাড়,
আমাদের মৃতদের ঘুম,
আর এক উঠোন থেকে আরেক উঠোনে হেঁটে যাওয়া
আত্মীয়তার সেই পুরোনো পথ।
ফেলে এসেছিলাম রাজবাড়ীও,
যেখানে পুণ্যাহের দিনে
দূরদূরান্ত থেকে মানুষ আসত,
উঠোন ভরে যেত মানুষের কোলাহলে,
ঢাকের শব্দে, উৎসবের আয়োজনে।
সেই রাজপ্রাসাদ,
যার দেয়ালে লেগে ছিল
কত প্রজন্মের হাসি, কান্না, ইতিহাস
আজ তার চূড়াও দেখা যায় না।
জলের নিচে শুয়ে আছে
একটি রাজ্য,
একটি সময়।
জল আসার আগে
পাহাড়ে কানাকানি শুরু হয়েছিল
কেউ বলেছিল, বাঁধ হবে,
কেউ বলেছিল, জল উঠবে,
কেউ হেসে উড়িয়ে দিয়েছিল
পাহাড় কি আর ডুবে যায়!
তারপর একদিন
নদীর চেয়ে বড় হয়ে উঠল মানুষের ভয়।
রাতের অন্ধকারে এক বাড়ি থেকে আরেক বাড়িতে
খবর যেতে লাগল ফিসফিস করে -
“জল আসছে।”
সেই রাতেই
আমরা বুঝেছিলাম,
ঘর মানে শুধু চারটি দেয়াল নয়,
ঘর মানে উঠোনে শুকোতে দেওয়া ধান,
মায়ের হাঁড়ি, বাবার দা,
বোনের বিয়ের জন্য তুলে রাখা কাপড়,
ভাইয়ের হাতে বাঁধা সুতো,
আর দরজার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা
একটি পুরোনো গাছও।
তারপর নৌকা নামল।
একটি নৌকা,
দুটি নৌকা,
শত শত নৌকা
পেছনে রইল ডুবতে থাকা ঘর,
সামনে অজানা কোনো তীর।
কেউ নৌকায় তুলল বৃদ্ধ মাকে,
কেউ কোলে নিল জ্বরের শিশুকে,
কেউ শেষবারের মতো ফিরে তাকিয়ে দেখল
তার পিতার ভিটেটুকু
জলের নিচে চলে যাচ্ছে।
পথে কত ভাই হারাল বোনকে,
কত বাবা হারাল ছেলেকে,
কত মা বুকের শিশুকে আঁকড়ে
অচেনা রাতের অন্ধকারে বসে রইল
সকাল হলে যার আর কোনো উত্তর নেই।
কোথাও নৌকা থামেনি,
কোথাও পথ ছিল না,
ছিল শুধু পাহাড়ি অন্ধকার
আর অচেনা জলের শব্দ।
কেউ অসুখে পড়ে রইল মাঝপথে,
কেউ জ্বরের আগুনে পুড়ে নিঃশব্দে চলে গেল,
কেউ মাটির দেখা পাওয়ার আগেই
জল আর জঙ্গলের মাঝখানে
নিজের শেষ শ্বাসটুকু রেখে গেল।
যারা পৌঁছেছিল,
তারাও কি সত্যিই পৌঁছেছিল?
নতুন জায়গায় ঘর বানানো যায়,
কিন্তু পুরোনো উঠোন বানানো যায় না।
নতুন জমিতে বীজ ফেলা যায়,
কিন্তু পিতার জমির মাটি
হাতের মুঠোয় ফিরিয়ে আনা যায় না।
নতুন প্রতিবেশী পাওয়া যায়,
কিন্তু হারিয়ে যাওয়া আত্মীয়তার
সেই একসঙ্গে বড় হয়ে ওঠা পৃথিবীটি
আর কোথাও পাওয়া যায় না।
তাই আমাদের বলা হলো -
জুম করো।
যে মানুষ সমতল উর্বর জমিতে
ধান ফলাত,
তার হাতে তুলে দেওয়া হলো পাহাড়ের ঢাল।
যে মাটি একদিন আমাদের ভাত দিত,
সে মাটি গেল জলের তলায়,
আর আমরা হয়ে গেলাম
পাহাড় কেটে, আগুন জ্বেলে,
বীজ ছড়িয়ে বেঁচে থাকা মানুষ।
সমতলবাসী আজও অনেক সময় ভাবে
জুম তো পাহাড়িদের চাষ,
তাদের জীবনই এমন।
তারা জানে না,
জুম আমাদের পছন্দের ইতিহাস নয়,
এটি আমাদের হারানো সমতলের
এক দীর্ঘ হাহাকারের প্রতিধ্বনি।
একদিন যে মানুষ
নিজের ঘর থেকে নিজের ধানের গোলা পর্যন্ত
হেঁটে যেতে পারত,
তারই উত্তরপুরুষ আজ
পাহাড়ের ঢালে দাঁড়িয়ে
আকাশের দিকে তাকিয়ে ভাবে
আমাদের অপরাধ কী ছিল?
আমরা তো শুধু
আমাদের ঘরে থাকতে চেয়েছিলাম।
জল এসেছিল,
বাঁধ উঠেছিল,
বিদ্যুৎ জ্বলে উঠেছিল বহু দূরের শহরে
আর আমাদের পৃথিবীটা
ধীরে ধীরে জলের নিচে চলে গিয়েছিল।
আমরা ফেলে এসেছিলাম আমাদের সবকিছু।
তবু কিছু রাত আসে,
যখন হ্রদের দিকে তাকালে মনে হয়
ওই জলের নিচে এখনো
কোনো উঠোনে সন্ধ্যার প্রদীপ জ্বলছে,
কোনো মা দরজায় দাঁড়িয়ে ছেলেকে ডাকছে,
কোনো রাজবাড়ীর বারান্দায় পুণ্যাহের ভিড়,
আর কোনো শিশু যে জানে না
তার পৃথিবীটা ডুবে যাচ্ছে।
ইতিহাস সাক্ষী
জল তো সেদিনই এসেছিল।
ডুবে গিয়েছিলাম আমরা আসলে
তারও অনেক আগে।
রচনাকাল: ২৩-০৮-২০২৬ইং।
মন্তব্য করুন