রাত তখন ঠিক বারোটা।
পাহাড়ি শহরের ছোট্ট বারের দরজা ঠেলে দুজন যখন বাইরে বের হলো, মনে হলো কয়েক মুহূর্ত আগের পৃথিবীটা যেন দরজার ওপাশেই রেখে এসেছে তারা। ভেতরের আলো, মৃদু গান, মানুষের হাসি সব এক ঝটকায় পিছনে পড়ে গেল। সামনে শুধু পাহাড়ি রাত। কালো আকাশের নিচে আঁকাবাঁকা রাস্তা, দুপাশে অন্ধকার পাহাড় আর দূরে দূরে কয়েকটি লজের জানালায় জ্বলতে থাকা হলুদ আলো।
বের হতেই শীতল বাতাসের একটা ঝাপটা এসে দুজনকেই কাঁপিয়ে দিল।
পুরুষটি সঙ্গে সঙ্গে নিজের গলার মাফলার খুলে মেয়েটির দুই কান ঢেকে দিল।
–এটা পরো। তোমার কান ঠান্ডা হয়ে যাচ্ছে।
মেয়েটি হেসে তার বাহুতে আরও একটু জড়িয়ে গেল।
–তুমি?
–আমার কিছু হবে না।
মিথ্যে কথা। তার নিজের হাতও ঠান্ডায় জমে যাচ্ছিল। ওভারকোটের পকেটে দুহাত ঢুকিয়ে সে আঙুলগুলো ঘষতে লাগল।
বারটেন্ডার অনেক আগেই সাবধান করেছিল এগারোটার পর আর ট্যাক্সি পাওয়া যাবে না। তারা পাত্তাই দেয়নি। লজ মাত্র বিশ মিনিটের পথ। একটু হাঁটলেই হুইস্কির নেশাটাও কেটে যাবে।
কিন্তু এখন বিশ মিনিটের পথটাকে বেশ দীর্ঘ মনে হচ্ছে।
মেয়েটি তার বাহু ধরে টলতে টলতে হাঁটছে। কখনো সে সামনে চলে যাচ্ছে, কখনো পুরুষটি তাকে ধরে ফেলছে। আবার কোনো একটা জায়গায় পুরুষটির পা হড়কে গেলে মেয়েটিই তাকে আঁকড়ে ধরছে।
দুজনের হাসি মাঝেমধ্যে নিস্তব্ধ পাহাড়ি রাস্তায় ছড়িয়ে পড়ছে।
রাস্তার একপাশে কিছু কাঠের লজ। বন্ধ দরজা। নিভে থাকা জানালা। শুধু বারান্দার ছোট বাতিগুলো জ্বলছে। অন্য পাশে নিচে নেমে গেছে অন্ধকার খাদ। সেখানে বাতাসের শব্দ ছাড়া আর কিছু নেই।
মেয়েটি হঠাৎ থেমে গেল।
–দাঁড়াও।
–কী হলো?
সে কোনো উত্তর না দিয়ে পুরুষটির কোটের কলার ধরে নিজের দিকে টেনে নিল।
–তুমি খুব কাছে দাঁড়িয়ে আছ।
–তুমিই তো টানলে।
–বোঝ না কেন টেনেছি?
তারপর সে হেসে ফেলল।
পুরুষটিও হাসল।
মেয়েটি মাথা তার বুকে ঠেকিয়ে কয়েক মুহূর্ত দাঁড়িয়ে রইল। হুইস্কির গন্ধ, শীতের রাত আর তার শরীরের উষ্ণতা মিশে একটা অদ্ভুত ঘোর তৈরি করেছিল।
কিছুক্ষণ পর তারা আবার হাঁটতে শুরু করল।
পাঁচ মিনিটের মতো যেতেই মেয়েটি বলল,
–সিগারেট ধরাও।
পুরুষটি পকেট থেকে প্যাকেট বের করল। দুটো সিগারেট বের করে একটার আগুন দিয়ে আরেকটা ধরাল। অন্ধকারে দুটো লাল আগুন মিটমিট করতে লাগল পাহাড়ের বুকের মধ্যে হারিয়ে যাওয়া দুই ক্ষুদ্র জোনাকির মতো।
মেয়েটি ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে তার দিকে তাকাল।
–আজ তোমাকে খুব সুন্দর লাগছে।
–হুইস্কির দোষ।
–হতে পারে।
সে আবার কাছে এল।
পুরুষটি তার মুখের ওপর ঝুলে থাকা চুল সরিয়ে দিল। মেয়েটি চোখ বন্ধ করল। ঠান্ডা বাতাসের মধ্যে তাদের ঠোঁট এক হয়ে গেল।
চুম্বনটা দীর্ঘ হলো।
তারপর আরও দীর্ঘ।
মেয়েটি তার কোট আঁকড়ে ধরল। পুরুষটির হাত গিয়ে থামল তার কোমরে। কয়েক মুহূর্তের জন্য পাহাড়, রাস্তা, রাত সব যেন দূরে সরে গেল।
হঠাৎ মেয়েটি চোখ মেলে বলল,
–আমার চাবি!
–কী?
–লজের চাবি। মনে হয় বারে ফেলে এসেছি।
পুরুষটি বিরক্ত হয়ে মাথায় হাত দিল।
–তুমি এখানেই বসে থাকো। আমি নিয়ে আসছি।
মেয়েটি রাস্তার ঢালু পাশে বসে পড়ল।
–আচ্ছা আমি এখানেই থাকি। ওই তো বারের দরজা দেখা যাচ্ছে।
পুরুষটি একবার পেছনে তাকাল।
সত্যিই দেখা যাচ্ছে। অন্ধকারের মধ্যে বারটির দরজার ওপরে ছোট্ট আলো জ্বলছে।
–এখান থেকে কোথাও যেও না।
–না যাব না।
সে হাঁটতে শুরু করল। কয়েক মুহূর্তের মধ্যেই তার ছায়া অন্ধকারে মিলিয়ে গেল। মেয়েটি একা বসে রইল।
সিগারেটের শেষ আগুনটুকু নিভে গেল। বাতাস আরও ঠান্ডা হলো। তার চোখে ঘুম নেমে আসছিল।
তারপর-
পায়ের শব্দ। মেয়েটি মাথা তুলল।
–এত দেরি করলে? ঘুম পেয়ে গেছিল।
পুরুষটি সামনে দাঁড়িয়ে।
–চলো।
সে হাত বাড়িয়ে মেয়েটিকে তুলল।
মেয়েটি তার কাঁধে ভর দিয়ে দাঁড়াল।
–চাবি পেয়েছ?
–হ্যাঁ।
–তাহলে চলো।
লজে ফিরে দরজা বন্ধ হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে বাইরের পৃথিবীটা যেন কেটে গেল।
গরম পানির ঝরনার নিচে দাঁড়িয়ে মেয়েটি চোখ বন্ধ করল। শরীরের জমে থাকা ঠান্ডা ধীরে ধীরে গলে গেল। পুরুষটি তার চুলের ভেজা জল মুছে দিল। সে হাসতে হাসতে বলল,
–আজ তাড়াতাড়ি ঘুমোতে দিও।
পুরুষটি উত্তর দিল না। শুধু তাকে কাছে টেনে নিল।
বাইরে তখন পাহাড়ি বাতাস জানালার কাচে আঘাত করছে।
ঘরের ভেতর ধীরে ধীরে গাঢ় হয়ে উঠল তাদের ঘনিষ্ঠতা। ঠান্ডা রাতের বিপরীতে দুটো শরীরের উষ্ণতা যেন আলাদা এক পৃথিবী তৈরি করল। হাসি, ফিসফিস কথা, আলিঙ্গন আর দীর্ঘ চুম্বনের মধ্যে রাত আরও গভীর হলো।
একসময় ক্লান্ত দুজন পাশাপাশি শুয়ে পড়ল। মেয়েটি পুরুষটির বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে গেল।
সকালে ঘুম ভাঙল রোদের স্পর্শে।
মেয়েটি চোখ মেলল।
পর্দার ফাঁক দিয়ে পাহাড়ি রোদ এসে বিছানার ওপর পড়েছে।
সে অভ্যাসবশত পাশ ফিরে হাত বাড়াল।
কেউ নেই।
পুরো বিছানা ঠান্ডা।
সে ধীরে ধীরে উঠে বসল।
চাদরটা একেবারে টানটান। পাশে কারও শোয়ার কোনো দাগ নেই। বালিশটাও অক্ষত। যেন সারারাত সে এই বিছানায় একাই ছিল।
মেয়েটি থমকে গেল।
গত রাতের কথা মনে পড়তেই তার বুক ধক করে উঠল। সে বিছানার অন্য পাশটা হাত দিয়ে ছুঁয়ে দেখল।
ঠান্ডা। একেবারে ঠান্ডা।
কোনো মানুষের শরীরের উষ্ণতার সামান্য চিহ্নও নেই।
সে বাথরুমে গেল। খালি।
ঘরের কোথাও পুরুষটির জামাকাপড় নেই। জুতো নেই। ওভারকোট নেই। কিন্তু নতুন একটা মাফলার চেয়ারের ওপর পড়ে আছে। ওটা আবার কোথা থেকে এল?
মেয়েটি মাফলারটা হাতে তুলে নিল।
তারপর দরজা খুলে বারান্দায় বের হলো।
সামনের দৃশ্য দেখে সে স্থির হয়ে গেল।
লজের নিচের ছোট্ট ঘরের সামনে কেয়ারটেকারের খাটে একজন পুরুষ শুয়ে আছে।
সে- তার প্রেমিক।
মেয়েটির মুখ থেকে কোনো শব্দ বের হলো না।
কেয়ারটেকার তখন পাশে দাঁড়িয়ে ছিল।
মেয়েটি কাঁপা গলায় বলল,
–ও এখানে কেন?
কেয়ারটেকার অবাক হয়ে তাকাল।
–স্যার তো রাতে অনেক পরে এসেছেন।
–কত রাতে?
–দেড়টার কাছাকাছি হবে। অনেকক্ষণ দরজায় নক করেছেন। আপনাকে ডাকাডাকি করেছেন। দরজা খুলছিল না। শেষে ঠান্ডায় কাঁপছিলেন। তাই আমার ঘরে শুতে দিয়েছি।
মেয়েটির মুখ শুকিয়ে গেল।
–কিন্তু…
সে ছেলেটির দিকে তাকাল।
–ও তো আমার সঙ্গে ছিল।
কেয়ারটেকার ভ্রু কুঁচকে বলল,
–আপনার সঙ্গে?
–হ্যাঁ। রাত বারোটার পর আমরা দুজন একসঙ্গে বার থেকে বেরিয়েছিলাম।
কেয়ারটেকার এবার আরও অবাক।
–কিন্তু ম্যাডাম, আপনি তো একাই এসেছিলেন।
মেয়েটি যেন শুনতেই পেল না।
–আমি একা?
–জি। আপনি রাত সাড়ে বারোটার কিছু পরে এসেছিলেন। দরজা খুলে ভেতরে ঢুকেছিলেন। তারপর দরজা বন্ধ করে দিয়েছিলেন।
মেয়েটি ধীরে ধীরে নিজের গলার মাফলারটার দিকে তাকাল।
তার আঙুল কেঁপে উঠল।
–কিন্তু… এটা?
কেয়ারটেকার মাফলারটার দিকে তাকাল।
–কার, এটা স্যারের?
মেয়েটি উত্তর দিল না।
তার মাথার ভেতর গত রাতের প্রতিটি দৃশ্য একসঙ্গে ফিরে আসতে লাগল। বার থেকে বের হওয়া। শীতল বাতাস। তার কানে জড়িয়ে দেওয়া মাফলার। সিগারেট। আঁকাবাঁকা পাহাড়ি রাস্তা।
চুম্বন।
তারপর পুরুষটির ফিরে আসা। তার হাত ধরে তাকে তোলা। লজে ফেরা। গরম পানির নিচে দাঁড়ানো।
বিছানায় পাশাপাশি শোয়া। আদর। সঙ্গম।
তার বুকে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়া।
সবই এত স্পষ্ট। এত বাস্তব।
যেন সে এখনও তার শরীরের উষ্ণতা অনুভব করতে পারছে।
কিন্তু বিছানায় তার পাশে কারও শোয়ার কোনো চিহ্ন ছিল না। একটুও না।
মেয়েটি ধীরে ধীরে মাথা তুলল।
তাদের গলার আওয়াজে খাটে শুয়ে থাকা পুরুষটির তখন ঘুম ভেঙেছে। চোখ মিটমিট করে বলল,
–তুমি আমাকে কখন বার থেকে ফিরে আসতে দেখেছ? বারটেন্ডার বার পরিষ্কার করায় ব্যস্ত ছিল। বারবার ধাক্কা দেওয়ার পরও দরজা খুলে দিচ্ছিলে না।
মেয়েটি স্থির হয়ে গেল।
পুরুষটি আবার বলল,
–আমি ফিরে দেখেছি… তুমি আর পথে নেই। লজে ফিরেছ ভেবে আমিও ফিরেছি। কিন্তু রুমের দরজা বন্ধ করে ততক্ষণে তুমি শুয়ে পড়েছ।
মেয়েটির গলা শুকিয়ে গেল।
–তাহলে আমি কার সঙ্গে লজে ফিরেছিলাম?
কেউ উত্তর দিল না।
দূরের পাহাড়ে তখন সকালের রোদ ঝলমল করছে।
আর মেয়েটির হাতে ধরা মাফলারটা হঠাৎ কেমন যেন বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে উঠল।
রচনাকাল: ২৬-০৮-২০২৬ইং।
মন্তব্য করুন