যখন জানতে পারি আর এক সপ্তাহ পরে আমাকে অন্যের করে দিবে তখন থেকে বাবা বা মায়ের প্রতি ঘৃণা অনুভব না করলেও ভালোবাসার অনুপস্থিতি বুঝতে পারলাম। অভিভাবককে ভালো না বাসলেও সম্মান করি বিধায় বিয়েতে সম্মতি দিয়েছি। তাছাড়া, আমার অসম্মতির ভাষা তাদের নিকট বিদেশী কোনো এক জাতীর ভাষার মতই অস্পষ্ট মনে হবে। স্কুলের গলিও অতিক্রম করা হলো না অথচ স্বপ্ন ছিলো আকাশের সীমানা ছাড়িয়ে দূর মহাকাশে পাড়ি জমানোর। অথচ অম্কুরেই স্বপ্নটা ধ্বংস হয়ে গেলো! কিন্তু এখনও স্বপ্ন দেখছি। একপাশে পরিবারের সিদ্ধান্ত অন্য পাশে আমার স্বপ্ন।
সাহায্য চাই। করবে কে? হঠাৎ মনে আসলো গ্রামের এক বড় আপুর কথা। খুশবু আপু। পড়াশোনা করছেন, এখনও বিয়ে করেন নি। তার সাথে আমার বয়সের ফারাক বোধ করি ৭/৮ বছর হবে। আমার বাবা-মা'র সামনে উনি খলনায়িকা রূপে আসেন। মনে মনে তাকে স্বর্গে নিবেদনের দোয়া করেও আপুর দ্বারা শেষ পর্যন্ত আমার বিয়ে আটকানো যায় নি। তবে খুব চেষ্টা করেছেন। এক পায়ে দাঁড়িয়ে বুঝিয়েছেন সবাইকে কিন্তু সবার চোখে উনি খলনায়িকা।
আপুর হাত ধরে টেনে রুমে এনে বললাম,
আমি: খুশবু আপু! গল্পটা বদলে যাক, ব্যস চরিত্রগুলো আগের মতো হোক।
খুশবু আপু: বাবা মা কখনো খারাপ কিছু প্রত্যাশায় রাখেন না। হয়তো তোর বাবা মাও আড়ালে তোর মঙ্গলের জন্যই এসব করছেন।
আমি: আর আমার মঙ্গল কামনার বহিঃপ্রকাশ হিসেবে আমাকে এভাবে ভোগান্তিতে রাখার পরিকল্পনা করছেন?
খুশবু আপু: শুন, তুই অনেক ভালো ফ্যামিলিতে যাচ্ছিস। এখন হয়তো তোর সব প্রশ্নের জবাব নেই কিন্তু আরও একটু বড় হ তখন বুঝবি। বাবা মা'কে ভুল বুঝিস না। ব্যস একটা কথাই বলবো, তুই মেয়ে। আর মেয়েরা- শিশু, কিশোর কিংবা বৃদ্ধ হোক নিরাপত্তাই আসল। লজ্জাই ভূষণ। তোর বয়স পনের ছুঁই ছু্ঁই। বাজে কিছু করবি না।
কথাগুলো বলে খুশবু আপু চলে গেলেন।
মনে মনে বার কয়েক আত্মঘাতীর কথা কল্পনা করেও করতে পারিনি। হঠাৎ মনে হলো, সৃষ্টিকর্তা পর্বত সমান পাপ করা পাপিকে তৎক্ষণাৎ শাস্তি না দিয়ে সুযোগ দেন তাহলে আমি এই বিয়েকে শাস্তি হিসেবে কেনো ভাবছি? আমি মেয়ে তাই আমি লড়াই করবো। শারীরিক, মানুষিকভাবে ভাঙবো গড়বো ঠিক যেমন কুমার কাদাকে মাটি আবার মাটিকে কাদা করে একটা সময় নতুন কিছু সৃষ্টি করেন।
আমিও নিজেকে ভাঙবো, ভাঙতে ভাঙতে যখন আমার মাঝে চূর্ণ হওয়ার অবশিষ্ট কিছুই থাকবে না, হারিয়ে ফেলার ভয় থাকবে না, থাকবে না কোনো পিছুটান তখন আমি সত্যিই হাসবো। অন্তত আজকের ন্যায় নাটকীয় হাসি নয়। সমাজের কিছু নামধারী, মুখোশধারী লোকের মতো সূর্যের আলো দিবো বলে উত্তাপে ধ্বংস করবো না বরং সবার মাঝে পূর্ণিমা রজনীর দীপ্তমান চাঁদের আলোর মতো আলো ছড়াবো। নষ্ট সমাজ ঐদিন মাথা নোঁয়াবেই। কঠোর থেকে কঠোরতম হতে হয়তো বিয়ে আমার জন্য সহায়ক, নিয়ামত স্বরূপ। সবাই বাল্য বিবাহ গ্রহণ করেছে আর আমি গ্রহণ করেছি তাকদিরের লিখন।
বিয়ে সম্পন্ন হয়েছে। বিয়েতে এমন কোনো কাজ বা নিয়ম ছিলো না যেটাতে আমার দ্বিমত ছিলো। হাসি মুখে সব পালন করেছি।
অয়ন মানে আমাকে সদ্য বিয়ে করা পুরুষ, বয়স উনিশের চৌকাঠে। আমাকে নিয়ে চলে যাচ্ছে। কেনো জানি না একটিবারের জন্যও বাবা মায়ের জন্য মন খারাপ হয়নি। তবে মানুষটা আমি ভিতরে মরে গিয়েছি। একটা ছোট পিঁপড়ের উপর গুলি করলে যতটা ব্যথায় পিঁপড়েটি শেষ হবে এরচেয়েও বেশি ব্যথা নিয়ে আমি হাসছি। কান্না পাচ্ছে না, চেষ্টাও করছি না। কিন্তু মা এত চিৎকার করে ধরণীর বুক কাঁপিয়ে কাঁদছেন কেনো? বাবাকে কখনো কাঁদতে না দেখলেও ঘরের পিছনে ফুঁপিয়ে কান্না করছেন।
কি হয়েছে আমার? আত্মীয় স্বজন সবাই কাঁদছে, আমার ছোট বোনও কাঁদছে। আল্লাহ্'র কাছে যেমনটি চেয়েছি মনে হচ্ছে এরচেয়েও বেশি কঠোর হয়েছি। কারো কান্নার শব্দ আমার ভিতরটা স্পর্শ করে নি, ঠিক যেমন আমার রক্তিম চক্ষুদ্বয়ের ভাষা কেউ পড়তে পারে নি।
তবে বুকের বাঁ'পাশটাতে নিরব ব্যথা অনুভব করছি। চোখ জোড়া শুষ্ক হলেও হৃদপিন্ড শব্দ ছাড়াই নিরবে, নিঃশব্দে কাঁদছে। এটাই শ্রেয়, এটাই উত্তম।
শ্বশুরবাড়িতে পা রাখলাম। আমার মুখে শ্বশুরবাড়ি শব্দটা বড্ড বেমানান মনে হচ্ছে, মানুষটা'ইবা আমি কতটুকু! এ বাড়িতে অন্তত বাবা মায়ের অভাব বুঝি নি। যদিও এর পূর্বে কখনও তাদেরকে ছাড়া থাকি নি। ম্যচিউরিটি বয়সে নির্ভর করে না তাই হয়তো এখন অনেক কিছুই বুঝি, বুঝার বাকিও আছে অনেক কিছু।
বেলা শেষ। এর আগে কোনো ভোর, গোধূলি এভাবে কাটে নি।
সন্ধ্যায় চারপাশের সবকিছু যেনো অস্পষ্টতা গ্রাস করছে। একাকীত্বের থাবায় আমার এমন মনে হচ্ছে নাকি সত্যিই এমন তা জানি না।
পুষ্প! পুষ্প- (কারো স্বর পেলাম যেন কেউ আমাকে ডাকছে৷)
পিছন ফিরে দেখি মহাশয় ডাকছেন। পূর্বে আমার স্কুলেই পড়াশোনা করেছিলো। দুষ্টু ছিলো অনেক। অগাধ জলের মাছও বলা যায়।
আমি: জ্বি, শুনছি।
অয়ন: খুব খুশি মনে হচ্ছে?
আমি: হ্যাঁ তা তো অবশ্যই। যে কাব্য রচনা করার জন্য কলম হাতে নিয়েছি, যে ইতিহাস রটাতে নিজেকে প্রস্তুত রেখেছি আজ একটা বিয়ের কারণে ঐ কলমটা ছাড়তে হলো।
অয়ন: কই না তো। বিয়ের সময় তো পেন্সিল না, কলম দিয়েই নাম লিখেছিলে হ্যাঁ না?
আমি: আরও কিছু বলতে পারেন, অভ্যস্ত।
অয়ন: ওহে অগ্নিশর্মা! তোমাকে কলম ছাড়তে বললো কে? আমি না হয় পড়াবো তারপর দেখবো এই যে পড়া নিয়ে এত মহান বাণী শুনাচ্ছো এর কতটুকু কাজে দেখাতে পারো।
আমি: সবাই যদি পড়তে না করে?
অয়ন: আমার পরিবারের সবারই ভিন্ন ভিন্ন পেশা আছে। কেউ কারো উপর নির্ভর করে না। তুমি কেনো স্বর্নলতা হয়ে থাকবে বলো?
আমি: আমার ইচ্ছাই কি সব?
অয়ন: যেহেতু তুমি এসএসসি দাওনি হয়তো সবাই পড়াশোনা করতে নাও দিতে পারে। তবে আমাদের অনুরোধ রাখবেন। চিন্তা নিও না। তুমি তো জানো প্রত্যেক সফল ব্যক্তির ব্যকগ্রাউন্ডটাই একটা যুদ্ধ ক্ষেত্র, সমস্যার রাজ্যে তাদের বসবাস, অসাধ্য সাধনের হাজারো ইতিহাস তাহলে তুমি কেনো পারবে না?
আমি: আমি যে ছোট। যে পথে হাঁটছি তার সীমান্ত আপনার কাছে এসেছে বাকিটা দেখার অপেক্ষা।
অয়ন: শুনো, তুমি মেয়ে। জন্মের পর থেকে বাবার পরিচয়ে আর এখন থেকে আমার পরিচয়ে বাঁচবে এতটুকুই? বাঁচতে হলে নিজের জন্য বাঁচো। তুমি যদি আমার উপর নির্ভর করে চলো আমি যদি কখনো তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিই তখন ফেলনা বা আগাছার মতো থাকবে।
আমি: বাবার বাড়ি?
অয়ন: বাবার বাড়িতে কত দিনই বা থাকতে পারবে? থাকলেও সমাজ উপাধি দিবে। বুঝো তো? আমি যদি আজই তোমাকে ছুঁড়ে ফেলে দিই আজ থেকে তোমার নামের পাশে ডিভোর্সি মেয়ে নামক উপাধি যুক্ত হবে। কেউ দেখবে না তুমি আমার সাথে কত দিন ছিলে সবাই ঐ উপাধিই দেখবে। তিল থেকে তাল হবে।
আমি: আমার নষ্ট সমাজ অনেক কিছুই পারে। শুধু পারে না সমস্যার একটা সুন্দর সমাধান দিতে।
অয়ন: এজন্যই তো। তুমি না হয় এই সমাজের রূপ, রীতি-নীতি পাল্টে দাও। নষ্টকে শ্রেষ্ঠ করো। এরজন্য তোমাকে ভালো একটা প্রফেশান চুজ করতে হবে। লক্ষ্য নিয়ে অগ্রসর হতে হবে। যেকোন সমস্যা থেকে শক্তি খুঁজে নাও। মেয়েরা ইচ্ছা করলে অনেক কিছু করতে পারে আবার মেয়েরা অনেক দিক থেকে অসহায়। যারা জীবনে কিছু করতে পারে তারা আর কারো কাছে শাসিত বা শোষিত হয় না।
একবার নিজেকে একটা ভালো পজিশানে দাঁড় করাতে পারলে আর পিছন ফিরতে হয় না। আর সফলতার ক্ষেত্র পড়াশুনা কোনো বাঁধা হতে পারে না। এরপরও জানার জন্য, নিজের ভিতর আচরণের দ্বারা মার্জিত শিক্ষার বাস্তবায়নের জন্যই পড়াশুনা। তো এখন ঘুমাও, আর পড়াশুনার জন্য সবার সম্মতির ব্যবস্থা করো।
সত্যিই। মানুষের কথাতেও একটা শক্তি। যে শক্তি ভিতরের আত্মাটাকে জাগ্রত করে। ক'জন পারে কথা দিয়ে, বুঝিয়ে আত্মাকে জাগ্রত করতে? ক'জনের জীবনেই বা এমন মানুষ থাকে? মানুষটা যতগুলো কথা বলেছে কোনটাই মিথ্যা না। মেয়েদের অনেক স্ট্রাগল করতে হয়। আমার এই যুদ্ধে প্রাণনাথ'ই না হয় আমার শক্তি, আমার হাতিয়ার।
কুয়াশার চাদরে যেনো পৃথিবী নিজেকে আড়াল করে রেখেছে। আর এ দিকে ওনার ফোনে এলার্ম বেজেই যাচ্ছে। ফোনটা পানির গ্লাসের ভিতর রেখে উপর থেকে পানি ঢেলে দিয়েছি। ফোনের মাথা ঠান্ডা হোক।
ভোরে উঠে ফ্রেশ হয়ে দেখি একজোড়া চোখ আমাকে গিলে নেয়ার জন্য প্রস্তুত হয়ে আছে। বুঝে নিলাম ফোনের মাথা ঠান্ডা হলেও মালিকের মাথা গরম। চুপ করে বসে আছি আর উনি বললেন,
অয়ন: এটা কি হলো পুষ্প?
আমি: সবাই বকা দিয়ে কথা বলে [ ভয়ে কেঁদেই দিলাম৷ ]
অয়ন: বাবা মা'কে ছেড়ে আসার সময় চোখের পানি কি বাষ্প হয়ে উড়ে গিয়েছিলো? এখন তো মনে হচ্ছে নৌকা ছাড়া যাতায়াত করা যাবে না। হয়েছে এবার বন্ধ কর।
একজন এসে আমাকে নিয়ে গেলেন পরক্ষণে জানতে পারি আমার মা। মানে শ্বাশুড়ি। চিনি না তো তাই এ সমস্যা। আমাকে একটা চেয়ারে বসতে বলে রান্না ঘরের সবকিছু দেখিয়ে দিচ্ছেন। মাথায় বাজ পড়লো। রাতে প্রফেশন নিয়ে কথা বলেছি এই বুঝি আমার অফিস!
আমি: মা, আমি তো হলুদ, মরিচ, এলাচ চিনি দেখে কি করবো?
মা একগাল হেসে বললেন,
মা: এখানে তো সবাই চাকরি করে। বিয়ে উপলক্ষ্যে সবাই'ই দু-তিন দিনের ছুটি পেয়েছে। আর আমাকে অফিসে ভোর আট টায় যেতে হয়। বাকি সবার কাজের জন্য এখানে থাকে না। তাই অতো একটা নাস্তার ঝামেলা পোহাতে হয় না। এরপরও আমি প্রতিদিন তোমার আর অয়নের নাস্তা রেখে যাবো, নাস্তা পছন্দ না হলে অন্য কিছু করে নিও তাই এসব দেখিয়ে দেয়া বুঝলে পুচকু?
আমি: হু, একটা কথা বলি?
মা: মাত্র?
আমি: না, একটা না অনেকগুলো কথা। আমি কি পড়তে পারবো না?
মা: মারবো। পড়বে না তো কি করবে? পড়তে তো হবেই। অয়নের বাবা মারা যাওয়ার পর থেকেই এই সংসারের সবকিছু আমার আয়ের উপর চলছে। অয়নের পড়াশোনা সবকিছু। অয়নের বাবার শখ ছিলো অয়নের জন্য একটা ছোট্ট বউ আনবে, আদর করবে নিজের মেয়ের মতো।
আমি খুশি হয়ে মাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরেছি ঠিক যেভাবে আমার মাকে ধরতাম। মাকে বললাম,
আমি: প্রাণনাথ কেনো বললো পড়ার জন্য সবাইকে রাজি করাতে হবে?
মা: ওর কথায় কান দিও না। সবার সাথেই এমন করে। আর কি বললে প্রাণনাথ.? কে শিখিয়েছে এটা?
আমি: মায়ের সাথে হবু বর নিয়ে গল্প করার সময় আমি "আমার প্রাণনাথ" বলেই গল্প করতাম।
মা: ওহ তাই! আচ্ছা আসো, সবার সাথে কথা বলবে তো। কাল পরশু দেখবে এ বাসায় মাথার সংখ্যা এক হাতের বেশি হবে না।
আমি: আচ্ছা।
সবার সাথে কথা বলা শেষ। আহ্ কথা বলেছি নাকি দুই ঘন্টা যুদ্ধ করেছি বুঝি নি। সন্ধ্যা পর্যন্ত দেখলাম বাসায় অয়ন, আমি, মা আর দিয়া কাকি ছাড়া কেউ নেই। দিয়া কাকি রান্না সহ ঘর গোছানোর কাজ করে।
সন্ধ্যায় চায়ের আড্ডায় মা বললেন,
মা: পুষ্প, আর দু-একদিন পর থেকে স্কুলে ফিরলে সমস্যা নেই তো?
আমি: না মা, সমস্যা নেই।
মা: ঠিক আছে।
গল্প করতে করতে রাতের খাবার শেষেই রুমে এসেছি। সব কিছু নিয়ে আমি হ্যাপি হলেও জানতে পারি নি হঠাৎ আমাকে বিয়ে দেয়ার সিদ্ধান্ত হলো কেনো। তবে ভালোই হয়েছে। ঐ দিন আত্মহত্যা করলে কি আর আজ জীবনের এই নতুন কিছু উপভোগ করতে পারতাম! খুশবু আপুর জন্য এক আকাশ ভালোবাসা যার কারণে আমি আত্মহত্যা থেকে ফিরে এসে নতুন কিছু দেখছি। উপভোগ করছি।
অয়ন আহমাদকে বললাম,
আমি: ওহে প্রাণনাথ! হাতে কি ওটা? নতুন ফোন?
অয়ন: হ্যাঁ, যখন চাকরি করবা বেতন থেকে কেটে নিবো। এখন যত নষ্ট করার করো, পরে সুদে-আসলে হিসাব করবো।
আমি: স্বপ্ন দেখেন। গুড নাইট।
দু-তিন দিন পর স্কুলে যাওয়ার কথা কিন্তু এক সপ্তাহ হয়ে গেলো সবাইকে ছেড়ে যেতে ইচ্ছা করছে না। সবাই মানে, হে হে নাম বলা নিষেধ।
অবশেষে স্কুলে যাওয়া শুরু হলো। অয়ন আমাকে পড়াশুনায় হেল্প করছে আর ও নিজের পড়াশোনার পাশাপাশি একটা এনজিও'তে জব করছে। এসএসসি'র রেজাল্ট আসলো। আল্লাহ্'র অশেষ রহমতে জিপিএ ফাইভ পেয়েছি। এই সংবাদে সব চেয়ে খুশি অয়ন।
রক্তের টানের চেয়ে নাড়ির টান বেশি কিন্তু আজ দেখলাম যার সাথে আমার রক্তের সম্পর্কও নেই সে আমার ভালো কিছুতে এত উৎফুল্ল! মানুষটার প্রতি শ্রদ্ধা, সম্মান এক কথায় ভালোবাসা হাজার গুণ বৃদ্ধি পেল। এখন মায়ের সাথে আমিও বাসার কাজ করি। দিয়া কাকিও আর আসেন না। পড়াশুনার পাশাপাশি একটু আধটু কাজ করতে আমার মোটেও মন্দ লাগে না। ইন্টার ফার্স্ট ইয়ার শেষ। কোন্ প্রফেশানে যাবো তা খুব ভাবাচ্ছে। অয়নকে বললাম,
আমি: প্রাণনাথ! কিছু তো বলবা। [ এখন আর আপনি বলি না। প্রমোশান হয়েছে তাই তুমি বলি৷ ]
অয়ন: মেয়েদের জন্য ভালো হচ্ছে আরামদায়ক পেশা। আই মিন, যেটাতে অসভ্য বসের মন্দ স্পর্শ বা বদনজরের শিকার হতে হবে না, বসের হুমকি ধমকি বা নির্যাতন সহ্য করতে হবে না, জীবনে ঝুঁকি কম থাকবে, মানুষ দেখা মাত্রই দাঁড়িয়ে যাবে, নিজের আসন ছেড়ে বসতে দিবে এমন কিছু। মানে দু-তিন ঘন্টা কাজ করে দিন শেষে লক্ষ টাকা পকেটে নিয়ে ফিরে আসবা। কোনো কাজ করবা না। ব্যাস কোনো কাজ শুরু করতে যেনো তোমার সিগনেচারের প্রয়োজন হয় এমন স্থানে নিজেকে নিয়ে যাও। নষ্ট সমাজ যেনো তোমার চোখের হুংকারময় ইশারায় পাল্টে যায়।
আমি: পাশে থাকবা তো?
অয়ন: পাশে থাকলে কি আর সবাই আমাকে জানবে? সবাই তো তোমাকে নিয়েই থাকবে, হুম।
আমি: আরে না আহমাদ স্যার। আমার নাম হবে পুষ্প আহমাদ আর তোমার পরিচয় পরে। কারণ আমার পরিচয়টাই তুমি।
সফল উদ্যোক্তার জন্য মন্ত্রীর হাত থেকে পুরষ্কার গ্রহণের জন্য আমি আর আমার প্রাণনাথ হাতে হাত দিয়ে, আঙ্গুলে আঙ্গুল আলিঙ্গন করিয়ে এগিয়ে গেলাম। হাজার হাজার মানুষের সামনে দাঁড়িয়ে আমি আমার সফলতার পিছনের গল্পের মূল শক্তি আমার প্রাণনাথকে সম্মাননা উৎসর্গ করে বলেছি,
"আমার হাত ধরে দাঁড়িয়ে আছে অয়ন আহমাদ এবং আমি পুষ্প আহমাদ। আর ঐ যে মায়ের কোলে আমাদের পুচকু।"
বক্তব্য শেষে বাসায় যাবো। এত এত সাংবাদিকের মাঝে পুলিশ আমাদের যাওয়ার ব্যবস্থা করে দিচ্ছেন হয়তো আমি আমার এবং প্রাণনাথের সপ্ন পূরণ করতে পেরেছি। বাসায় আসার পর অয়নকে বললাম,
আমি: তাহলে তুমিই ছিলে আমার ছোট বেলার গল্পের প্রাণনাথ।
অয়ন: এত বছরে প্রাণনাথ ছাড়া অন্য কিছু শুনি নি, ভাগ্য।
আমি: তুমি আমার প্রাণনাথ, প্রাণেশ্বর। আমার ভালো মন্দ সবটাই তুমি।
অয়ন: হ্যাঁ, তুমিও আমার হৃদয়েশ্বরী আমার অর্ধাঙ্গিনী।
জীবনটা বেশ রঙিন। বাবা মায়ের প্রতি তিক্ত অনুভূতি থাকলেও আজ মা আমাকে সবকিছুই বলেছেন। বয়সটা যখন পনের ছুঁই ছুঁই তখন কোনো এক ক্ষমতাশীল জানোয়ারের বিষাক্ত থাবার পরিকল্পনা বাবা মা বুঝতে পেরেই অনতিবিলম্বে আমাকে নিরাপদ স্থানে রাখতে বিয়ের সিদ্ধান্ত নেন। হয়তো খুশবু আপু এ কথাটা শুনেই বিয়ে করতে বলেছিলেন। বাবা মা'কে ভুল বুঝতে নিষেধ করেছিলেন।
মা শুধু আমাকে পশুর হাত থেকে রক্ষাই করেন নি, জীবন বদলে দিয়েছেন। হয়তো ভুল বুঝেছি তবে এখন অনুতপ্ত। প্রত্যকের মতো আমার জীবনের সফলতার পিছনে খুশবু আপু, বাবা-মা, শ্বাশুড়ি মা এবং আমার শক্তি প্রাননাথের কথা মনে রাখার মতই।
প্রত্যেকের ভালোবাসা, উৎসাহ এবং আমার প্রচেষ্টায় এখন আমি প্রতিষ্ঠিত, নিজের উপর নির্ভরশীল, আমার অধীনে কাজ করছে শত সহস্র মানুষ, যেকোন অবস্থায় আমার জন্য একটি আসন বরাদ্দ। তাছাড়া আমি এখন সাংসারিকও বটে। বয়স পনের'তে যে আমার পাশে ছিলো আমরণ পর্যন্ত তার পাশে থাকাটাই আমার প্রতিজ্ঞা।
0 মন্তব্যসমূহ