প্রায় প্রতিদিনই বইয়ের দাম কেন বেশি এই অভিযোগটা শুনি, আর নিজে ক্রেতা হিসেবে খুব টের পাই বইয়ের দাম আসলেই কতটা বেশি। মধ্যবিত্তের একটা অংশের পকেটে এখন অনেক টাকা এসেছে জানি, কিন্তু অনুমেয় কারণেই ক্রেতাদের বড় অংশ এখনও মাঝারি আয়ের চাকুরে আর শিক্ষার্থী— মুদ্রার হিসেবে আয় যতই বাড়ুক, মুদ্রামানের হিসেবে তাদের টানাটানি ঘুচবার নয়। সদ্য টাকা কামানো মধ্যবিত্ত কাওরান বাজারের মোড়ের জ্যামে বিল ক্লিনটনের মাই লাইফ জাতীয় দু’চারখানা বই কিনে সাজিয়ে রাখতে পারলেই খুশি, বাংলাদেশের প্রকাশনা শিল্পের মেরুদণ্ডস্বরুপ যারা, তাদের কিন্তু ট্যাকে অর্থ ততটা নেই।
বইয়ের ক্রেতা কম হবার অনেকগুলো কারণের প্রধান একটি বইয়ের দাম বেশি–পাঠকদের অধিকাংশের মত এই। ওদিকে, বিক্রি এত কম বলেই বইপ্রতি মুনাফা তুলনামূলকভাবে বেশি রাখতে হয়, প্রকাশকদের সাফ জবাব। জনপ্রিয় বইগুলোর কথা বাদ দিলে ‘মননশীল’ বলে পরিচিত বইয়ের ক্রেতা-প্রকাশক এই এক আশ্চর্য দুষ্টচক্রে আটকা পড়ে আছেন, কিন্তু এই পারস্পরিক দোষারোপে পরিস্থিতির জন্য আসলে যা দায়ী, তাই আড়ালে থেকে যাচ্ছে।
হুমায়ুন আহমেদের বই বিক্রি নিয়ে তো সঙ্কট নেই, তার বইয়ের দাম কিন্তু ফর্মা প্রতি অত্যধিক বেশি। ফেব্রুয়ারি ২০১২ সালে অন্যপ্রকাশ প্রকাশিত হুমায়ূন আহমেদ এর ৯৬ পৃষ্ঠার উপন্যাস পায়ের তলায় খড়ম এর দাম ২৫০ টাকা। ৬ ফর্মা বইটির দাম ফর্মাপ্রতি সাড়ে ৪১ টাকা, বলা উচিত অগ্নিমূল্য। খুব বেশি অভিযোগ কি হুমায়ুন আহমেদের বইয়ের দাম নিয়ে করা হয়? একইভাবে আর আর সব জনপ্রিয় লেখকের বইয়ের দামও তাদের নিজ নিজ ‘রেট’ অনুযায়ী বেশি। কৈ, তাদের বই তো মুড়ির মত-ই বিক্রি হয়, অটোগ্রাফ দিতে দিতে এই সাহিত্যিকগণ ফালগুনের মিষ্টি আবহওয়াতেও ঘেমে উঠছেন, এমন সংবাদও তো পত্রিকাতে আসে, তাহলে এখনও ২৫ টাকা ফর্মায় আটকে থাকা প্রকাশকরা কেন অভিযোগের শিকার হবেন?
আবার, প্রবন্ধের বেলায় বইয়ের দাম ভয়াবহ বেশি দেখা যাবে ইউপিএল এর প্রকাশিত বইগুলোর বেলায়। প্রকাশনাটির দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সাথে কথা বলে জেনেছি, খুবই স্বল্পসংখ্যক (সাধারণত শ’ পাঁচেক) বই সাধারণত তারা ছাপেন। বেশ উল্লেখযোগ্য অভিজাত প্রকাশনী আছে যারা প্রকাশিত বইয়ের একটা বড় অংশ লেখক কিনে নেবেন–এটাও চুক্তিতে উল্লেখ থাকে।
দেশে গড়ে ওঠা এনজিও খাত এবং এর সাথে সংশ্লিষ্ট গবেষণা ইত্যাদি আনুষঙ্গিক চাহিদা মেটায় মূলত ইউপিএল। কিন্তু এর বাইরের পাঠকদের নিয়ে তাদের খুব বেশি ভাবনা আছে, সেটা মনে করাটা কঠিন। সংস্করণ শেষ হয়ে গেলে বহুক্ষেত্রেই তারা পুনঃপ্রকাশ করেন না, এমন অভিজ্ঞতা পাঠক হিসেবে আমার নিজেরই হয়েছে কয়েকটা জরুরি গ্রন্থের সন্ধান করতে যেয়ে। বইগুলোতে সাধারণভাবে মুদ্রনসংখ্যা উল্লেখ না থাকাতে ঠিক কত বই প্রকাশিত হয়েছে, সে তথ্যও আমরা জানি না, মুনাফার হার কিংবা অন্যান্য খবর আমরা পাই না। কিন্তু তারপরও, জনপ্রিয় ধারার উপন্যাস ছাপিয়ে কিংবা ‘তহবিলপুষ্ট’ অভিজাত এই প্রকাশকদের মুনাফার সঙ্কট নেই বলেই অনুমান করি । এই উভয় ক্ষেত্রেই ক্রেতা সুনির্দিষ্ট এবং সুনিশ্চিত।
এর বাইরে যে সব প্রকাশক তহবিলপুস্ট না, শিল্পপতি-আমলাদের রচিত না এবং জনপ্রিয় না এমন সব গবেষণা-নিবন্ধ-উপন্যাস-কবিতা ইত্যাদি ছাপেন, মূল সঙ্কটটা দেখা যাবে তাদেরই। দাম বাড়াতে তারা পারছেন না, কারণ বিক্রি আরও কমে যাবে; আবার পাঠক কম বলে এবং দাম কম রাখতে হচ্ছে বলে খরচা তোলা এবং প্রকাশনার ক্ষেত্র বিস্তৃত করা কঠিন হয়ে যাচ্ছে। নতুন একটা বিষয়ের বই ছাপার উদ্যোগ নেবেন কিনা, পাঠক আদৌ সাড়া দেবেন কি না, ছাপা হলে কত ছাপা উচিত হবে, বেশি ছাপলে গুদামে টাকা আটকে থাকবে কি না, কম ছাপলে আবার বইপ্রতি দাম বেশি হবে— হাজারটা অস্থির মূহূর্ত তাকে পাড়ি দিতে হয়, কেননা শেষ পর্যন্ত প্রকাশনা শিল্পও একটা বাজারই বটে, লাভ-লোকসানের হিসেবের ওপরই তারও টিকে থাকা নির্ভর করে। এই প্রকাশকের বিপদের অন্ত নেই— ছাপখানা, বাঁধাইকার, কাগজ কোনটাই সে বাকিতে পায় না, একমাত্র যার পাওনা সে ঝুলিয়ে রাখতে পারে, তিনি বেচারা লেখক।
ওদিকে পাঠকের কী দশা? খেয়াল করলেই দেখা যাবে সামাজিক শ্রেণীগত গঠন অনুযায়ী ক্রেতাদের অনেকগুলো ধরন আছে। আমরা যখন ছাত্র ছিলাম, প্রতিদিনের জমানো টাকা আর খুচরো পয়সায় মাসান্ত বইকেনার হিসেব-নিকেশে মাত্র পাঁচ-দশ টাকার এদিক-ওদিকই বহুবার পছন্দ নির্ধারণে ভূমিকা রেখেছে। তারপরও তখন ছিল ঢাকায় পুরনো বই আর সোভিয়েত বইয়ের বেশুমার ঢল— মূলত সেগুলোই পড়ুয়াদের বইয়ের খোরাক মেটাতো। জোগানের এই অংশে আজকাল বেশ টান পড়েছে, ফুটপাথের বইপত্রেরও ব্যাপক দাম বেড়েছে গত কয় বছরে। এখনও আমি বইয়ের দোকানে কোনো কম বয়েসী ক্রেতার সবচে’ পছন্দ হওয়া বইটা নাড়াচাড়া করা, পৃষ্ঠা উল্টে দামটা দেখে নিয়ে পঁচিশ ভাগ কমিশনে কত হতে পারে তার একটা আন্দাজ নিয়ে নেয়া, তহবিলের দশাটা মনে মনে হিসেব করা, কল্পনা করে তারপর সেটা পাশে সরিয়ে আরেকটু পাতলা-দেখে বইগুলোর মাঝে বাছাই করা, কিংবা এটা-সেটা আলাপ আর শুভেচ্ছা বিনিময় করে বিদায় নেয়া—অথবা সব দ্বিধা কাটিয়ে পছন্দের বইটা কিনে ফেলার ঝুঁকিটা নিয়েই নেয়া দেখে পরিস্থিতিটা ঠিক টের পাই; পছন্দের একটা বইয়ের মালিক হতে পারার যে দুর্লভ অনুভূতি, তারই খানিকটা আভাস তার শরীর জুড়ে সংক্রমিত হয়। আমার কাছে এটা খুবই ন্যায্য একটা প্রশ্ন— বই কেনার জন্য, জ্ঞানের খোরাকি পাবার জন্য পাঠককে এত দ্বিধার পাহাড় পাড়ি দিতে হবে কেন?
সম্ভাব্য ক্রেতাদের শ্রেণীগত পার্থক্যের প্রভাবটি দেখা যাবে একই লেখকের একাধিক প্রকাশনী থেকে প্রকাশিত বইয়ের তুলনা করলে। অনুবাদ আর সাক্ষাতকারভিত্তিক দুটো আলাদা গ্রন্থের— প্রকাশনার মান দুটোতেই যথেষ্টই ভাল— মূল্য নির্ধারণে একটিতে রাখা হয়েছে ফর্মা (ষোল পাতা) প্রতি ২০ টাকার কম, অপরটিতে ৩২ টাকা! দ্বিতীয় ঘটনাটি প্রকাশক-লেখকের জন্য লাভজনক সন্দেহ নেই, কিন্তু পাঠকের জন্য বিপত্তির। কিন্তু দ্বিতীয় ক্ষেত্রে যদি বিক্রি উল্লেখযোগ্য পরিমাণও বৃদ্ধি পায়, লেখক আবার খুব সামান্যই লাভবান হবেন। উচ্চমূল্য আবার পাঠকের সংখ্যাকে সীমিত করতে পারে, ফলে উচ্চবিত্ত ক্রেতাকে আকর্ষণ করতে চাইবেন দ্বিতীয় প্রকাশক, বিপুল লাভের একটা অংশ তিনি বিজ্ঞাপনেও খরচ করতে দ্বিধা করবেন না। প্রথম প্রকাশক আবার চাইবেন প্রকাশনার খরচ যথাসাধ্য সীমিত রাখতে, কারণ বিক্রি প্রতি সামান্য মুনাফা করছেন তিনি।
পাঠককে বই না কেনার জন্য অভিযুক্ত করাটা আমার কাছে চিন্তাহীন অভিযোগ বলে মনে হয় সর্বদাই। পছন্দের বইটা সংগ্রহ করতে না পারার বেদনার হিসেব কি এই প্রকাশক-বিক্রেতা-অভিযোগকারীরা রাখেন? বরঞ্চ বইয়ের দাম প্রধানত যে কারণে বেশি, প্রকাশনা শিল্পের সাথে জড়িত ক্ষমতাবানদের তা নিয়ে উদ্বেগ বেশ কম। পাঠককে এর জন্য দায়ী করাটা একদমই অবান্তর এবং এর সাথে অনেক বেশি সম্পর্ক প্রকাশনা শিল্পের খরচ-বৃদ্ধি ও সরকারী পৃষ্ঠপোষকতার সাথে। গত দশ বছরেই এই দেশে ফর্মা প্রতি দাম ১০ টাকা থেকে ২৫/৩০ টাকায় পৌঁছেছে, কাগজসহ আর সব খরচ আকাশছোঁয়া। এছাড়াও আছে ক্রেতার সংখ্যা হ্রাস। দুনিয়ার প্রায় সব সভ্য দেশে বইয়ের প্রধান ক্রেতা ব্যক্তিমানুষ নন, সেটা শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসমেত নানান প্রতিষ্ঠান এবং পাঠাগার। মুনাফার বড় অংশটা সেখানেই নিশ্চিত হয়ে যাবার ফলে শিক্ষার্থী কিংবা কম আয়ের পাঠকদের জন্যও সুলভ-সংস্করণ বের করা সম্ভব হয়। আমাদের দেশেও ততটা না হলেও বছর বিশেক আগে কিছু বই এইভাবে ক্রয় করা হতো বটে, এখাতে মাঝখানে চলেছে যাকে বলে সম্পূর্ণ নৈরাজ্য, বর্তমানে প্রায় বন্ধ।
আহমদ শরীফ, বদরুদ্দীন উমর ও সিরাজুল ইসলাম চৌধুরীর মত লেখকদের বই প্রকাশকরা আশির দশকের প্রথম দিকে দেড় হাজার বা তার বেশি মুদ্রনসংখ্যায় প্রকাশ করতেন বলে কয়েকজন পুরনো প্রকাশকের কাছে শুনেছি। নব্বই দশকে খ্যাতনামা লেখকদেরও অধিকাংশ প্রবন্ধের বইয়ের মুদ্রনসংখ্যা নাকি পাঁচ-ছয়শোর কমেই হতো। এই মুহূর্তে কিন্তু খ্যাতনামা অধিকাংশ লেখকের কারও কারও বই আবারো হাজার-দেড় হাজার অতিক্রম করার প্রবণতা দেখা যাচ্ছে, অন্তত এক হাজার মানসম্পন্ন বই বিক্রি করা যাচ্ছে। যে কারণেই হোক (আমার ধারণা সোভিয়েত ইউনিয়ন এর পতনজনিত হতাশা) আশির দশকের তুলনায় নব্বইয়ের দশকে বইপত্রের পাঠকসংখ্যা হ্রাস পেয়েছিল। এখন এই সংখ্যাটি খুব সামান্য হারে হলেও বৃদ্ধি পাচ্ছে। বিজ্ঞানের জনপ্রিয় ধারার বইপত্রের কথা বললে আশির দশকের তুলনায় নব্বই প্রায় ফাঁকা গিয়েছে। অথচ যে ক’টি বিজ্ঞানের বই বাজারে আসছে, সেগুলোর বিক্রি ঈর্ষণীয়।
এই সেদিনও, পশ্চিমবঙ্গ রাজ্য পুস্তক পর্ষদ খুব জনপ্রিয় ছিল এদেশের ক্রেতাদের কাছেও। সস্তায় দুর্দান্ত সব বই পাঠকদের কাছে তুলে দিতেন তারা, এবং দুর্ভাগ্য, পশ্চিমবঙ্গের বামফ্রন্ট সরকার থাকতে থাকতেই পুস্তক পর্ষদের বইয়ের দামও আকাশছোঁয়া হয়ে উঠলো। আগেই বলেছি, বাংলাদেশে যারা ভাল বই বের করে ‘সুখ্যাত’, তাদের বই বরাবরই অগ্নিমূল্য, হাতেগোণা কয়েক জনের হাতে বইটা পৌঁছে দিয়ে মুনাফাটা দ্রুত পকেটস্থ করতে পারলেই তারা বেঁচে যান। যেমন জেসম ওয়াইজ এর পূর্ববঙ্গের বিভিন্ন জাতি, বর্ণ ও পেশার বিবরণ: তৃতীয় ভাগ গ্রন্থটির বিজ্ঞাপনের তথ্যগুলো ঘেঁটে বোঝা যাচ্ছে ২০০২ সালে যখন ফর্মাপ্রতি ১০-১২ টাকা রাখাটা ছিল দস্তুর, ১৫ টাকা রাখাটা অত্যাচার, তখন নিশ্চিন্ত মনে ইউপিএল গুরুত্বপূর্ণ এই বইটির দাম ফর্মা প্রতি ২০ টাকারও বেশি রেখেছে । অথচ তাদের ছাপা এবং বাঁধাই উভয়টিই মাঝারি, এর চেয়ে অনেক ভাল মানের প্রকাশনায় অনেক কম দর রাখার বহু উদাহরণ দেয়া যাবে।
মুদ্রনসংখ্যা জানার অভাবে যদিও আমরা বইটার বিক্রির হাল হকিকত জানতে পারছি না, কিন্তু গ্রন্থটির পুনর্মুদ্রন প্রয়োজন হয়নি, বইটি এখনও পাওয়া যাচ্ছে তাও জানা যাচ্ছে। এই উচ্চমূল্য সত্ত্বেও উচ্চ চাহিদার কারণে কোন কোন বইয়ের পুনর্মুদ্রন তারা করতেও সক্ষম হয়েছে। অন্যদিকে কমদামে বই প্রকাশের খ্যাতি ছিল মুক্তধারার, সেগুলোর বেশ কটিরই বিদ্যায়তনিক ও রাজনৈতিক গুরুত্ব ছিল, জনপ্রিয় ধারার প্রবন্ধ-সাহিত্যের সংস্কৃতি গড়ে তুলতে মুক্তধারা বিশাল ভূমিকাই রেখেছে। যতদূর জানি, ইউপিএল এবং মুক্তধারা উভয়ই লেখকের সম্মানীর বিষয়ে সর্বদা সতর্ক থেকেছে, আর একেবারে জনপ্রিয় ধারার বাণিজ্যিক প্রকাশনী সেবা সুলভতম মূল্যে পাঠক-লেখক উভয়ের স্বার্থ রক্ষা করে তাদের প্রকাশনা অব্যাহত রেখেছে।
বিজ্ঞাপন দেয়া হয় না, পাঠক জানতেই পারেন না বইয়ের খবর, এটাও একটা আলোচিত অভিযোগ। কিন্তু দেশের সর্বাধিক প্রচারিত দৈনিকগুলোর মাধ্যমে ফেব্রুয়ারি মাস জুড়ে অর্থের বিনিময়ে বিজ্ঞাপন এবং পত্রিকার বিবেচনায় উত্তীর্ণ এই দুই বর্গের যে সকল গ্রন্থের সাথে পাঠক পরিচিত হয়েছেন, তা এমনকি বাংলাদেশের প্রকাশনার বাস্তবতাকে কতখানি প্রতিফলিত করে? ‘জনপ্রিয় সাহিত্য’ ক্রমবর্ধমান হারে ‘বিজ্ঞাপন’ এবং প্রচ্ছদ ছাপানোর ‘তদবির’ এর সকল পন্থাই গ্রহণ করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু দৈনিক পত্রিকাতে মোটামুটি জনপ্রিয় একজন লেখক যখন সাত থেকে দশ লাখ টাকার বিজ্ঞাপন প্রদান করেন বলে ‘গুজব’ শোনা যায়, বিজ্ঞাপনের এই বাজারে যারা ‘অজনপ্রিয়’ ধারার বই প্রকাশ করেন, তাদের জন্য পরিস্থিতিটা খুব মুশকিলের হয়ে যায়। বিজ্ঞাপন বাবদ প্রতিটি পয়সাই শেষ পর্যন্ত বইয়ের খরচের সাথেই যুক্ত হবে, অন্যদিকে দৈ্ত্যাকৃতির তিন কলাম ৬ ইঞ্চি জোড়া অসংখ্য বিজ্ঞাপনের পাশে তার ক্ষুদে উপস্থিতিটা আদৌ দৃষ্টিগোচর হবে কি না সেই আশঙ্কা ঘোচার নয়।
বইয়ের ভাল-মন্দ নির্ণয়ের চূড়ান্ত এখতিয়ার কারও না থাকাটাই নিরাপদ, তারপরও পত্রিকাগুলোর স্রেফ বাণিজ্যের তাড়নায় বিজ্ঞাপনের নীতিমালা না থাকাটা প্রকাশকদের জন্য বিপত্তির; আরও দৃষ্টিকটু গণমাধ্যমে চাকরিরত, তাদের সাথে সম্পর্কিত কিংবা ইত্যাদি সূত্রে সম্পর্কিত লেকককূলের প্রচারণা। দৃষ্টিকটু ঠেকে জনপ্রিয় জনৈক ঔপন্যাসিকের অটোগ্রাফ দিতে দিতে ‘ঘর্মাক্ত’ বগলদেশের কথা কিংবা নিজের পত্রিকায় নিজেরই রচনার নিয়মিত শংসামূলক পর্যালোচনা প্রচারিত হওয়া। বিশেষ করে উঠতি বয়েসের বিশাল সংখ্যক পাঠককে বড়শিবিদ্ধ করতে এই কৌশল নেয়া হয়, আর এই সবকিছুকে হালাল করতেই যেন তুলনামূলকভাবে গ্রহণযোগ্য অল্প আরও কিছু গ্রন্থেরও আলোচনা এবং প্রচ্ছদ ইত্যাদি সেখানে ছাপা হয়ে থাকে।
কিন্তু পাঠকরা নন, আমাদের প্রকাশনা শিল্পের সবচে করুণ শিকার লেখকরা। প্রয়াত একজন অগ্রগণ্য ঔপন্যাসিক-ছোটগল্পকারের অগ্রন্থিত সমগ্র সম্পাদনা করার অভিজ্ঞতা বর্ণনা করলেন বন্ধুস্থানীয় একজন গবেষক-কথাসাহিত্যিক, বইটির কাজ শেষ করে তিনি পেয়েছিলেন হাজার পাঁচেক টাকা, তার যাতায়াত-ফটোকপি ইত্যাদি খরচেরই নামমাত্র প্রতিমূল্য। প্রকাশক কিন্তু যথেষ্টই খ্যাতিমান এবং গ্রন্থটিও ব্যবসায়-সফল।
দশ ফর্মার একটি বইয়ের দাম বাইশ টাকা ফর্মা হিসেবে দাঁড়ায় ২২০ টাকা, ৩০ টাকা ফর্মা হিসেবে দাঁড়ায় ৩০০ টাকা। পাঁচশ মুদ্রন সংখ্যা হলে বইয়ের দাম সর্বমোট হয় যথাক্রমে ১ লাখ ১০ হাজার টাকা বা ১ লাখ ৫০ হাজার টাকা। প্রথমক্ষেত্রে ১০ ভাগ হারে লেখকের সম্মানী হয় ১১ হাজার টাকা, ১৫ ভাগ হারে লেখকের সম্মানী হয় ১৬ হাজার ৫০০টাকা। দ্বিতীয় ক্ষেত্রেরটাতে সম্মানী সামান্য কিছুটা বাড়বে, যদিও তাতে ক্রেতার আপত্তি থাকবে। ফলে বইমেলা শেষে সকলেই কিছু-না-কিছু নিয়ে বাড়ি যান, কেবল লেখকই ফেরেন প্রায় খালি-হাতে, মন্তব্য আরেক কথাসাহিত্যিক বন্ধুর।
তো, অধিকাংশ ক্ষেত্রে লেখকেরা এই সামান্য সম্মানীও কিন্তু বুঝে পান না, যদি সম্পূর্ণ বুঝে পেয়েও থাকতেন, দেখাই যাচ্ছে সেটা যৎসামান্য। রচনায়, গবেষণায় বা অনুবাদে এই লেখকেরা যে সময়-মেধা-শ্রম নিয়োজন করেন, সেই বিবেচনায় অন্য কিছু না, স্রেফ বাজারি টিকে থাকার মূল্যটাও বইয়ের-বাজারে নেই। বিজ্ঞাপনে কিংবা আরও কিছু সংগঠিত প্রচারাভিযানে এবং ক্রেতাদের সম্পর্কিত করার নানান উদ্যোগে ব্যক্তিগত পর্যায়ের ক্রেতাদের সংখ্যা বাড়তে পারে বটে, কিন্তু সেটা কতটা আর বাড়বে? গবেষণামূলক বইপত্রের বেলায় মনে হয় না অধিকাংশ ক্ষেত্রে ব্যক্তিগত ক্রেতাদের সংখ্যা বিশাল একটা উচ্চ পর্যায়ে নেয়া যেতে পারে, তাহলে তো ইউপিএল থেকে প্রকাশিত রেহমান সোবহানের বইগুলোরই প্রচারসংখ্যা বিশাল হতো ।
ক্রেতাদের পক্ষে বইগুলো কেনা কঠিন, অথচ বইগুলো প্রয়োজনীয়ও বটে। লেখকের দিক থেকে একটা সমাধান হতে পারতো বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা একাডেমী এবং এ জাতীয় প্রতিষ্ঠানসমূহ যদি গবেষক-লেখক-অনুবাদকদের যথাযোগ্য একটা সম্মানী দিয়ে সুলভে গ্রন্থ প্রকাশের উদ্যোগ নিতো। অবশ্যই, কোন দেশেই সরকারী সংস্থাগুলো এই কাজটি সম্পূর্ণাংশে করতে পারে না, আর সেটা করাটা স্বাস্থ্যকরও না। কেননা এই সরকারী প্রতিষ্ঠানগুলোর দৃষ্টিভঙ্গিগত একটা সীমাবদ্ধতা থাকে বলেই নতুন চিন্তার প্রকাশে তার একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ বিঘ্নস্বরূপ হতে পারে। কিন্তু তারপরও, প্রতিষ্ঠানগুলোর কার্যকর উপস্থিতি মানদণ্ড নির্ধারণ করে পরিস্থিতির মাঝে ইতিবাচক ভূমিকা রাখতে পারতো।
বইয়ের বাজার ব্যক্তিগত ক্রেতাদের পর্যায়ে একটা শোভন মাত্রায় নেয়ার প্রধানতম উপায় সরকারের দিক থেকে কাগজের দাম কমানো, সেক্ষেত্রে একই খরচে ক্রেতা বাড়তি বই কিনতে পারবেন; বিজ্ঞাপনের একটা অন্তত ভদ্রোচিত শোভন নীতিমালা গণমাধ্যমের তরফ থেকে উপস্থিত করা যাতে বিজ্ঞাপনের বাজারে পরিসর দখল করে কেউ একচেটিয়া প্রচার গ্রহণ করতে না পারে এবং সর্বোপরি নানান রকমের উদ্যোগ নেয়া যেতে পারে যাতে পাঠকরা বই পড়তে উদ্ধুদ্ধ হন। এবং গ্রন্থের সংস্কৃতি যাতে সমাজে গড়ে ওঠে, উপহার সামগ্রী হিসেবে বই গুরুত্ব পায়, বই না পড়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ের শিক্ষার্থীরা যেন পাশ করতে না পারে –এমন একটা আবহ গড়ে তুলতে পারলে আরও। কিন্তু, এই সকল উদ্যোগেরই একটা সীমা আছে, এবং লেখালেখি টিকে থাকার মত একটা পেশায় পরিণত হতে পারবেই না যদি না ব্যক্তিগত পর্যায়ের ক্রেতাদের বাইরে পাঠাগার-প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি পর্যায়ে বিপুল পরিমান গ্রন্থ ক্রয়ের বন্দোবস্ত করা সম্ভব না হয়। আমাদের দেশের সরকারি পাঠাগার, ব্যক্তিপর্যায়ের পাঠাগার, পাড়াতো পাঠাগার, বাণিজ্যিক প্রতিষ্ঠান, বিদ্যালয়-উচ্চবিদ্যালয়- বিশ্ববিদ্যালয় কতটা বই কিনছে? তাদের জবাবদিহিতা কী? সেই খবর কেউ নিচ্ছেন না।
হুমায়ুন আহমেদ এর পাঠকরা বইয়ের দাম বেশি বলে প্রকাশকদের অভিযুক্ত করছেন না, অথচ অজস্র বিক্রির বদৌলতে তার এবং সমগোত্রীয় লেখকদের বইয়ের দাম অনেক কম হবার কথা ছিল। বিপুল বিক্রির কারণেই হুমায়ুন আহমেদের গ্রন্থ এমন একটি পণ্য যার উৎপাদনের জন্য বাড়তি আর কোন পৃষ্ঠপোষকতার প্রয়োজন নেই। কিন্তু হেরোডোটাস এর অনুবাদ করার জন্য কিংবা মধ্যযুগে পতুর্গীজ-বাঙলা বাণিজ্য সম্পর্ক বিষয়ে অনুসন্ধান চালাতে অথবা বিজ্ঞান বিষয়ে মানসম্পন্ন একটা গ্রন্থ তৈরি করতে গ্রন্থকারকে যে পরিশ্রম করতে হয়, সামাজিক-পৃষ্ঠপোষকতা ছাড়া সমাজে সে কাজটিকে সম্ভব করাটা কঠিন। আমাদের দেশে তাই এই ধরনের কাজগুলো এত কম, এবং তা স্বতঃস্ফূর্ত ও বিচ্ছিন্ন পর্যায়েই রয়ে গিয়েছে। এমন একটা মৌলিক কর্মের মুদ্রনসংখ্যা অন্তত হাজার কয়েক হলে বিচ্ছিন্ন ক্রেতা যেমন কম দামে ভাল বই পেতেন, লেখক-অনুবাদকও নতুন ক্ষেত্রে কাজ করতে অনুপ্রাণিত হতেন, তার টিকে থাকার সঙ্কট দূর হতো। কিন্তু প্রতিষ্ঠানগুলো বই না কিনলে পরিস্থিতি সে জায়গায় নিয়ে যাওয়াটা অসম্ভব প্রায়।
জনপ্রিয় ধারার প্রকাশক কিংবা লেখকের তহবিলপুস্ট প্রকাশক উভয়েরই এই নিয়ে মাথাব্যাথা তেমন একটা দেখা যাচ্ছে না। কারণ সেটা হলে তাদেরও কিছু লাভ হতেই পারে বটে, কিন্তু বিশাল মুনাফা তারা বর্তমান পরিস্থিতিতেও করছেন!
পরিস্থিতির বদলে তাদের নিরুৎসাহের কারণটা টের পাওয়া যাবে তাদের একটা বড় অংশের তালিকার দিকে চোখ বোলালে—প্রকাশনায় নতুন উদ্দীপনা আনতে কতটা অসচেষ্ট তারা। কিন্তু পরিস্থিতির যারা উত্তরণ চান, সেইসব পাঠক, লেখক এবং প্রকাশকের জন্য জরুরি হলো সমাজের আর সব অংশের গণতন্ত্রায়নের মতই প্রকাশনার বাজারটাকেও গণতান্ত্রিক করার সংগ্রামটা জারি রাখা, কর্তাদের প্রশ্নের মাঝে ফেলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক গ্রন্থ ক্রয়ের সংস্কৃতিটি চালু করতে বাধ্য করা। এমপিদের গাড়ি কেনার শুল্ক বাবদ যে টাকা সরকার গচ্চা দেন, তার চেয়েও কম টাকা প্রকাশনা শিল্পে ভর্তুকি দেয়া হলে মৌলিক রচনা এবং পাঠাভ্যাস উভয়টিতেই একটা বড়সড় বদল আসবে। এই টাকাটা জনগণেরই, ফলে ন্যায্য অধিকারবোধ থেকেই দাবিটি উত্থাপন করা যেতে পারে।
প্রকাশকাল: ০৯-০৩-২০১২ইং৷
মন্তব্য করুন